
প্রতিনিধি 7 October 2026 , 11:09:47 প্রিন্ট সংস্করণ
সুখ ও শান্তি বলতে কি বুঝি আমরা? সুস্থতা, সুখী জীবন, অঢেল পয়সাপাতি, অট্টালিকায় বসবাস, এই তো? যদি লিওনেল মেসিকে প্রশ্নটা করা হয়, জানতে চাওয়া হয় শান্তি ও সুখের সঠিক অর্থ? রোজারিও জাদুকরের উত্তরটা কী দেবেন, কী হতে পারে তাঁর অভিব্যাক্তি? প্রশ্নটা আপনার জন্য তোলা রাখলাম, যদি আপনি মেসি ভক্ত হয়ে থাকেন, তবেই নিজের মতো করে একটি উত্তর সাজাবেন।
আপতদৃষ্টিতে আমার কাছে এই মুহুর্তে মেসিকে জগতের সবচেয়ে সুখী মানুষদের একজন মনে হচ্ছে। ঠিক ততটাই, যতটা আপনি আপনার কল্পনার জগতে হেঁটে-ঘুরে মেসির বিদায়ী ম্যাচ দেখা উত্তর সাজানোর চেষ্টা করছেন।
কেন বলছি, কী কারণে? মেসি আজ বেনিনের বিপক্ষে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বিদায়ী ম্যাচ খেলেছেন, যেখানে উপস্থিত ছিলেন পরিবারের সকল সদস্য। মা- সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিতিনি, স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো এবং তিন সন্তান- থিয়াগো, মাতেও ও চিরো। আর বাবা হোর্হে? তিনিও তাঁকে দেখছেন, তাঁর সফল পুত্রকে- দূর আকাশ থেকে, গ্রোগ্রাসে। আর দাদি, প্রিয় মানুষটা? যাকে উদ্দেশ্য করে গোলের পর দুই হাত আকাশপানে তুলে ধরেন মেসি? তিনিও নিশ্চিয়ই হাসছেন আদুরে নাতির সুন্দর বিদায় দেখে।
মাত্র ১২ বছর বয়সে কেবল একটু সুখ ও উন্নত জীবনের আশায় রোজারিওর ধুলোবালির শহর ছেড়ে স্পেনে পা রেখেছিলেন মেসি। যার চিকিৎসা ব্যায় চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল আর্জেন্টিনা, যার নামটা পর্যন্ত জানা ছিল না দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের, সেই দেশের হয়ে খেলতে মুখিয়ে ছিলেন মেসি।

পর্যায়ক্রমে দেশকে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা আরও অসংখ্য ট্রফি উপহার। আর্জেন্টিনা তো বটে বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শত কোটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানো ব্যক্তিটাই তো বিদায়ী ম্যাচের আগে স্ট্রেইট এবং বোল্ডলি বলতে পারেন— ‘আমি শান্তিতে বিদায় নিচ্ছি। আমি সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছি।’
একটা সময় আসে, যখন কিংবদন্তিরও থামতে হয়। মেসির জন্য সেই সময়টা ছিল আজই। আকাশি-সাদা জার্সিতে আজই বুয়েন্স আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে শেষবার মাঠে নেমেছেন তিনি। বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে শেষ হয়ে তার আর্জেন্টিনার হয়ে ২১ বছরের পথচলা।
বিদায়ী ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগেই আবসর নিয়ে নীরবতা ভাঙেন মেসি। আর্জেন্টিনার মানুষের উদ্দেশে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় লেখেন— আমি শান্তিতেই বিদায় নিচ্ছি। এর আগে অবশ্য আরেক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন— আমি দলটাকে মিস করবো।
মেসি যতটা তার দলটাকে মিস করবে, ঠিক তারচেয়েও বেশি তাকে মিস করবে আর্জেন্টিনা। একটি দেশের সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা (২০৮), সর্বোচ্চ গোল (১২৬), সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট (৭০) করা ব্যক্তিটা কিন্তু মেসিই। যার ক্যারিয়ারের ২১ বসন্ত উজাড় করা ছিল শুধুই আলবেসেলেস্তা দলের জন্য।
শুধুই গোল-অ্যাসিস্ট দিয়ে এই জাদুকরকে মাপা সম্ভব? না, তিনি তো নিজেই আস্ত এক বিশ্বকাপ ইতিহাস। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ (৩৪), গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সর্বোচ্চ অবদান (৩৩) এবং বিশ্বকাপের সর্বকালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ শট (১৪০), শট অন টার্গেট (৬৪), সুযোগ তৈরি (৯৯) এবং সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবলিংয়ের (২৫০) রেকর্ডে একক সাম্রাজ্য গড়ে বিদায় নিচ্ছেন মেসি।
অথচ এই পথটা কতটাই না বন্ধুর ছিল মেসির জন্য। ২০১৪ সালের রিও-ডি-জেনিরোর সেই নিস্তব্ধ রাতে বিশ্বকাপ ট্রফিটার পাশ দিয়ে তাঁর শূন্য ও তৃষ্ণার্ত চোখে হেঁটে যাওয়ার করুণ দৃশ্য, কিংবা টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে গিয়ে ২০১৬-র ডাগআউটে বসে শিশুর মতো অবিরত কান্না-পুরো ফুটবল বিশ্বের বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। নিজের প্রিয় দেশের মানুষই যখন তাঁকে ‘পরবাসী’ বলে বিষোদ্গার করছিল, অভিমানে ফুটবলের এই মহানায়ক তখন জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়ে ফেলেছিলেন।
কিন্তু মহাকাব্যের আসল নায়ক তো এত সহজে ট্র্যাজেডিতে বিলীন হতে পারেন না! পতন আর ব্যর্থতার সেই ঘোর অমানিশা না থাকলে যে পুনরুত্থানের শেষ অঙ্কটি এত রোমাঞ্চকর হতে পারত না!
টানা ব্যর্থতার সেই ঘন কালো মেঘ কেটে আশার প্রথম সূর্যকিরণ দেখা দিল ২০২১ সালে, মারাকানায় ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু নিয়তি তাঁর পরম উপাসকের জন্য শেষ নাটকীয় দৃশ্যপটটি সাজিয়ে রেখেছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। ৩৫ বছর বয়সী এক বিষণ্ণ জাদুকর, যাঁর ভঙ্গুর কাঁধে সওয়ার ছিল কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন ও প্রার্থনার সুবিশাল পাহাড়।
সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচেই আচমকা হারের ধাক্কায় যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল, তখন থেকেই শুরু হলো ভস্ম ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ডানা মেলে অবিশ্বাস্য এক উড্ডয়নের গল্প! মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই দূরপাল্লার রকেট শট, নেদারল্যান্ডসের নিরেট রক্ষণচেরা পাসের সেই অলৌকিক জ্যামিতি, আর ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপের পরাক্রমশালী ফ্রান্সের সাথে সেই রক্তহিম করা স্নায়ুযুদ্ধ!
লুসাইল স্টেডিয়ামে যখন টাইব্রেকারের শেষ শটটি নেটের ভেতরের জালে জড়িয়ে গেল, মেসি দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন সবুজ ঘাসের ওপর। সারা পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ তখন বাঁধভাঙা আনন্দের অশ্রুতে সিক্ত! গায়ের ওপর ঐতিহ্যবাহী কালো ‘বিশত’ জড়িয়ে যখন তিনি অবশেষে সেই অধরা সোনার ট্রফিটা আসমানের পানে উঁচিয়ে ধরলেন, ফুটবল খেলাটি নিজেই যেন ধন্য হলো—পূর্ণতা পেল তার শতাব্দীর সেরা রূপকথা!
আর এই রূপকথা জন্ম দিয়েই, একাধিক প্রজন্মের হৃদয়ে হিরোর স্থানে থেকেই, বীরের বেশে মাঠ থেকেই শেষ ম্যাচটি আজ খেলে ফেললেন মেসি। বিদায় নক্ষত্র।