
প্রতিনিধি 5 August 2026 , 11:27:45 প্রিন্ট সংস্করণ

আইনজীবীর কালো গাউন থেকে পুলিশের খাকি ইউনিফর্ম- দেশসেবার নতুন অঙ্গীকারে এক অনুপ্রেরণার গল্প
স্বপ্ন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং লক্ষ্যপূরণের অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে কোনো বাধা অতিক্রম করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। এমনই এক অনন্য উদাহরণ ঝিনাইদহের কৃতি সন্তান আহসান উল্লাহ। সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে সফল কর্মজীবন শুরু করার পরও তিনি থেমে থাকেননি। মানুষের আরও কাছাকাছি থেকে কাজ করার স্বপ্ন তাকে নিয়ে গেছে বাংলাদেশ পুলিশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পদ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি)-এর আসনে। ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা হিসেবে তার এই অর্জন ইতোমধ্যেই তরুণ সমাজের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি রাজশাহীর সারদায় অবস্থিত বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রথম পর্যায়ের মৌলিক প্রশিক্ষণের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি নবীন কর্মকর্তাদের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করায় অভিনন্দন জানান। বক্তব্যে তিনি বলেন, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, জনবান্ধব ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে দক্ষ, সৎ ও মানবিক কর্মকর্তাদের বিকল্প নেই। তিনি নবীন কর্মকর্তাদের সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সংবিধানের প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, প্রশিক্ষণার্থীদের অভিভাবক এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। প্রশিক্ষণার্থীদের সুশৃঙ্খল মার্চপাস্ট, ড্রিল এবং পেশাদার কুচকাওয়াজ উপস্থিত সবার প্রশংসা কুড়ায়। এই সমাপনী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রথম ধাপের মৌলিক প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
এই ব্যাচের বহু মেধাবী কর্মকর্তার মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় আসেন ঝিনাইদহের সন্তান আহসান উল্লাহ। কারণ, তার কর্মজীবনের পথচলা ছিল অন্যদের তুলনায় ব্যতিক্রমী। একজন আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তিনি নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। আইন পেশা থেকে সরাসরি পুলিশ ক্যাডারে যোগদান তার দৃঢ় মনোবল, দেশপ্রেম এবং আত্মবিশ্বাসেরই বহিঃপ্রকাশ।
আহসান উল্লাহর শৈশব কেটেছে ঝিনাইদহে। পরিবারের স্নেহ-ভালোবাসা এবং বাবা- মার সুশিক্ষাই ছিল তার জীবনের প্রথম ভিত্তি। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং পরিশ্রমী। পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহ এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা তাকে সব সময় আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। আহসান উল্লাহ ঝিনাইদহের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কাঞ্চননগর মডেল স্কুল থেকে কৃতিত্তের সাথে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। এরপরে তিনি ঝিনাইদহ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে তিনি ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পাশাপাশি আইন বিষয়ে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।

বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ একজন কর্মকর্তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে শারীরিক সক্ষমতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, আইনি জ্ঞান, অস্ত্র পরিচালনা, তদন্ত কৌশল, মানবাধিকার, তথ্যপ্রযুক্তি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে একজন দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে গড়ে ওঠেন। আহসান উল্লাহও সেই কঠিন প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠানে বাবাকে পাশে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাবার অবদান স্মরণ করে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, পরিবারের অবিচল সমর্থন, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং সহকর্মীদের অনুপ্রেরণাই তাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তিনি সুপ্রিম কোর্টের সহকর্মী আইনজীবী, বন্ধু-বান্ধব এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।
আহসান উল্লাহ বলেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তার প্রধান লক্ষ্য হবে জনগণের আস্থা অর্জন করা। তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণ, কিশোর গ্যাং দমন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, চুরি-ডাকাতি প্রতিরোধ এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে চান। তার বিশ্বাস, জনগণের সহযোগিতা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে একটি মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ পুলিশের সামনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে, মাদক পাচার নতুন নতুন কৌশলে পরিচালিত হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক নানা অপরাধও বেড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহার এবং জনসম্পৃক্ত পুলিশিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন ও সমাজ সম্পর্কে আহসান উল্লাহর শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা তাকে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে বলে অনেকেই মনে করেন।
আহসান উল্লাহর এই অর্জন ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। ঝিনাইদহবাসী, সহপাঠী, সহকর্মী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অনেক তরুণ তার জীবনসংগ্রামকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছেন। কারণ, তিনি প্রমাণ করেছেন—একটি পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও যদি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সাহস থাকে, তাহলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব।
ঝিনাইদহের এই কৃতি সন্তানের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি জেলার গর্ব, পরিবারের গর্ব এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প। আইনজীবীর কালো গাউন থেকে পুলিশের খাকি ইউনিফর্মে তার এই যাত্রা প্রমাণ করে, দেশসেবার ইচ্ছা থাকলে পেশা বদলালেও আদর্শ বদলায় না। সততা, মেধা, অধ্যবসায় এবং মানুষের জন্য কাজ করার অঙ্গীকারই একজন প্রকৃত রাষ্ট্রসেবকের সবচেয়ে বড় পরিচয়। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পুলিশের একজন দক্ষ, মানবিক ও জনবান্ধব কর্মকর্তা হিসেবে আহসান উল্লাহ দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন-এমন প্রত্যাশাই সবার।