
প্রতিনিধি 3 October 2026 , 5:35:04 প্রিন্ট সংস্করণ
একসময় লিওনেল মেসি ও দিয়াগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে একই মাঠে নেমেছেন তিনি। আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলেছেন বিশ্বকাপজয়ী গোলকিপার এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেসের সঙ্গে। এমনকি রিভার প্লেটের সর্বকালের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ ব্যাচের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ক্যারিয়ারের গল্পটা মোড় নেয় একদম বিপরীতমুখী এক বাস্তবতায়! খুব কম বয়সেই পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে জীবনযুদ্ধের প্রয়োজনে তাকে নেমে পড়তে হয় গ্যাস সিলিন্ডার, আলু আর শাকসবজি সরবরাহের কাজে।
জীবনযুদ্ধের এই করুণ গল্পটি আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার গনজালো ওলিদ আপাজার।
মাত্র ১২ বছর বয়সে রিভার প্লেটের একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন এই গনজালো ওলিদ আপাজার। অনুশীলনে যোগ দেওয়ার জন্য প্রতিদিন সান মিগুয়েল থেকে লম্বা পথ পাড়ি দিতেন তিনি। যুব ফুটবলে এই দলটি টানা পাঁচটি শিরোপাও জেতে। কিন্তু রিভার প্লেটের মূল দলে নিজেকে কখনোই শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেননি তিনি। একপর্যায়ে নিয়মিত একাদশে খেলার সুযোগের খোঁজে পাড়ি জমান নিচের সারির লিগগুলোতে।

অবশ্য মাঠে চমৎকার পারফরম্যান্সের কারণে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের দরজাও খুলে গিয়েছিল তাঁর জন্য। কিংবদন্তি উবালদো ফিওলের আহ্বানে বয়সভিত্তিক দলে ডাক পাওয়ার পর তিনি অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৭ এবং অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে খেলেন। ২০০৯ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ ও অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে খেলেছেন দিবু মার্তিনেসের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।
সংবাদমাধ্যম ‘ইনফোবাই’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিবুর সেই শুরুর দিনগুলোর স্মৃতি মনে করে আপাজা বলেন, ‘আজকে ও যতটা আত্মবিশ্বাসী, তখনও ওর মাঝে ঠিক একই আত্মবিশ্বাস দেখেছি। তাই ও ক্যারিয়ারে যা যা অর্জন করেছে, তার কোনোটিতেই আমি অবাক হইনি।’
নাইজেরিয়ায় অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের আগে বয়সভিত্তিক দলের তরুণদের জাতীয় দলের সঙ্গে অনুশীলনে ‘স্পারিং পার্টনার’ বা প্রতিপক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তখনকার জাতীয় দলটির কোচ ছিলেন খোদ ম্যারাডোনা। প্রতি বুধবার তারা মাঠে লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনার বাকি তারকাদের সঙ্গে অনুশীলন করার সুযোগ পেতেন।
সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে আপাজা বলেন, ‘ম্যাচটিতে ডিয়াগো নিজেই রেফারির দায়িত্ব পালন করেছিলেন! আমরা মেসির সঙ্গে খেলেছি, সেখানে বড় বড় সব তারকা উপস্থিত ছিলেন।’
অভিজ্ঞতাটি কতটা স্বপ্নের মতো ছিল তা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অনুশীলনের মাঝপথেই আমার মনে হতো গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরি! সত্যিই এটা বাস্তবে ঘটছে নাকি আমি স্বপ্ন দেখছি, তা বিশ্বাস করতে নিজেকে চিমটি কাটতে হতো।’
মেসির অভাবনীয় প্রতিভা সম্পর্কে সংবাদমাধ্যম ‘টিএন’-কে আপাজা বলেন, ‘মেসি তার স্বাভাবিক গতির মাত্র অর্ধেক দিয়ে খেলছিল, কিন্তু তাতেই মনে হচ্ছিল ও নিজের শতভাগ উজাড় করে খেলছে।’
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যাম্বাসেরেসের হয়ে একটি ম্যাচ খেলার পর আপাজা নিজের বাবাকে ফোন করে জানান, তিনি পেশাদার ফুটবল ছেড়ে দিচ্ছেন। সিদ্ধান্তটির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমি খেলাটা উপভোগ করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। অনুশীলন শেষ হওয়ামাত্রই যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফিরে আসার জন্য মন ছটফট করত।’
পেশাদার ফুটবল ছাড়ার পর এক বন্ধুর হাত ধরে তাঁর জীবনের প্রথম কাজের সুযোগ আসে। সেই বন্ধু বাড়ি বাড়ি পানির জার সরবরাহ করতেন। প্রতিদিন ভোর পাঁচটা থেকে কাজ শুরু করতে হতো আপাজাকে। পরবর্তীতে ফুটবল খেলে জমানো টাকা দিয়ে তিনি একটি ট্রাক কেনেন এবং পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হন।
বর্তমানে বাজার, বার ও রেস্তোরাঁগুলোতে আলু, পেঁয়াজসহ নানা ধরনের শাকসবজি সরবরাহের ব্যবসা সফলভাবে পরিচালনা করছেন আপাজা। জীবন নিয়ে কোনো আফসোস নেই এই সাবেক ফুটবলারের। হাসিমুখে তিনি বলেন, ‘আমি ফুটবল খেলা কিন্তু কখনোই ছাড়িনি; শুধু পেশাদার হিসেবে খেলাটা বন্ধ করেছি। আর নিজের এই সিদ্ধান্তে আমি এখন ভীষণ সুখী।’