
প্রতিনিধি 19 July 2026 , 1:04:17 প্রিন্ট সংস্করণ

সময় কখনো কখনো এমন এক বৃত্ত আঁকে, যেখানে অতীতের ক্ষতই হয়ে ওঠে নতুন ইতিহাসের মঞ্চ। যে মাঠে একদিনর চোখে নেমে এসেছিল পরাজয়ের অশ্রু, সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই আজ জ্বলছে নতুন এক স্বপ্নের আলো। এক দশক আগে যে মাঠ ছিল হতাশার প্রতীক, ২০২৬ সালে সেটিই হতে পারে তার আরেকটি মহাকাব্যিক অধ্যায়ের সূচনাস্থল। দশ বছর পর সেই একই মাঠে আবার নামছেন মেসি, লক্ষ্য দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি। ফুটবলের গল্প যে কতটা নাটকীয় হতে পারে, মেসির ক্যারিয়ার যেন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।
২০১৬ সালের ২৬ জুন। কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসরের ফাইনাল। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও চিলি। ১২০ মিনিটের লড়াইয়েও গোলের দেখা মিলল না। ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব গেল টাইব্রেকারে। আর্জেন্টিনার প্রথম শট নিতে এগিয়ে গেলেন অধিনায়ক মেসি। কিন্তু সেদিন তার পা যেন সঙ্গ দিল না। বল উড়ে গেল ক্রসবারের ওপর দিয়ে। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জয় তুলে নিল চিলি। -শুধু একটি ফাইনাল হার নয়, সেই রাতের বেদনার পেছনে ছিল দীর্ঘ এক হতাশার ইতিহাস। ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ কোপা আমেরিকা এবং ২০১৬ কোপা আমেরিকা, টানা তিনটি বড় ফাইনালে পরাজয়। ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের পাহাড় গড়া মেসি তখনও জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপার অপেক্ষায়। সেই অপূর্ণতা যেন তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল।
ফাইনালের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে মেসির একটি ঘোষণা স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো ফুটবল বিশ্বকে, ‘জাতীয় দলের সঙ্গে আমার পথচলা শেষ। আমার জন্য জাতীয় দল শেষ।’

কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, এটাই বুঝি শেষ। আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর দেখা যাবে না ফুটবলের এই মহাতারকাকে। কোটি সমর্থকের প্রিয় নায়ক এভাবেই বিদায় নেবেন, তা কেউ মেনে নিতে পারেননি।
তবে মহান গল্পের শেষ অধ্যায় কখনো কখনো লেখা হয় ঘুরে দাঁড়িয়ে। সমর্থকদের ভালোবাসা, সতীর্থদের অনুরোধ এবং নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন মেসিকে আবার ফিরিয়ে আনে জাতীয় দলে। কারণ, তিনি জানতেন, তার গল্প তখনও শেষ হয়নি।
এরপর শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। ২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতেন মেসি। এরপর ২০২২ সালে ফিনালিসিমা জয়। আর সেই বছরের ডিসেম্বর, কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলে ধরেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
যে মেসিকে একসময় জাতীয় দলের ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে সমালোচনা করা হতো, সেই মেসিই পরিণত হন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়ক। নিজের অপূর্ণতার গল্পকে তিনি বদলে দেন সাফল্যের মহাকাব্যে।
এবার ভাগ্য তাকে আবার ফিরিয়ে এনেছে সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। একই মাঠ, একই গ্যালারি, একই সবুজ ঘাস, কিন্তু মানুষটি আর আগের সেই ভেঙে পড়া মেসি নন। তিনি এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা এবং ফুটবল ইতিহাসের এক অমর অধ্যায়।
ফুটবল মাঝে মাঝে এমন গল্প লেখে, যা কোনো চিত্রনাট্যকারের কল্পনাকেও হার মানায়। যে জায়গায় একদিন একজন কিংবদন্তি নিজের স্বপ্নের সমাপ্তি দেখেছিলেন, সেই জায়গাটাই আবার হয়ে ওঠে নতুন স্বপ্ন পূরণের মঞ্চ।
রবিবার যখন মেসি মেটলাইফ স্টেডিয়ামের টানেল পেরিয়ে মাঠে নামবেন, হয়তো এক মুহূর্তের জন্য ফিরে আসবে ২০১৬ সালের সেই রাতের স্মৃতি। তবে এবার তার চোখে থাকবে না বিদায়ের অশ্রু। থাকবে ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় লেখার স্বপ্ন। তাইতো ফুটবল পাড়ায় প্রশ্ন একটাই, যে মাঠে একদিন কেঁদেছিলেন মেসি, সেখান থেকেই কি এবার হাসিমুখে ফিরবেন ফুটবলের এই মহাতারকা?