
প্রতিনিধি 17 June 2026 , 11:35:41 প্রিন্ট সংস্করণ

বয়স ৩৯ ছুঁইছুঁই। ক্যারিয়ারের প্রায় সবকিছুই জিতে নিয়েছেন। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ব্যালন ডি’অর, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ- ফুটবলের প্রায় প্রতিটি স্বপ্নই পূরণ হয়েছে তার। তবুও লিওনেল মেসি যেন থামার নামই জানেন না। ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে অন্যতম সেরা ফুটবলার।
কানসাস সিটিতে গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলের দাপুটে জয় উপহার দিয়েছেন অধিনায়ক মেসি। তার জাদুকরী পারফরম্যান্সে শিরোপা ধরে রাখার মিশন শুরু করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাচ শুরুর পর থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। পঞ্চম মিনিটেই জালে বল পাঠিয়ে উল্লাসে মেতেছিলেন মেসি। কিন্তু অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। তবে তাতে দমে যাওয়ার মানুষ তিনি নন।
১৭ মিনিটে রদ্রিগো দি পলের পাস থেকে বল পেয়ে কয়েকজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে দুর্দান্ত এক শটে গোল করেন মেসি। তার সেই গোলেই এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধে আর কোনো গোল না হলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি আলবিসেলেস্তেদের হাতে।
বিরতির পর আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকা। ম্যাচের ৬০ মিনিটে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের নেওয়া শট আলজেরিয়ার গোলরক্ষক ঠিকমতো সামলাতে পারেননি। ফিরতি বলে সুযোগ নষ্ট করেননি মেসি। সহজ ফিনিশে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি।
এরপর ৭৬ মিনিটে পূর্ণ করেন নিজের হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে এটিই ছিল মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক। তার তিন গোলেই ৩-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
এই ম্যাচটি শুধুমাত্র একটি জয় নয়, বরং ছিল মেসির অসাধারণ কিছু ব্যক্তিগত অর্জনেরও সাক্ষী।
হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৬-তে নিয়ে গেছেন মেসি। এর ফলে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে এসেছেন তিনি। এতদিন ১৬ গোল নিয়ে এককভাবে শীর্ষে ছিলেন ক্লোসা।

বিশ্বকাপে মেসির গোলযাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। সেই আসরে করেছিলেন ১ গোল। এরপর ২০১৪ বিশ্বকাপে ৪ গোল, ২০১৮ সালে ১ গোল, ২০২২ সালে ৭ গোল এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই যোগ করলেন আরও ৩ গোল। দুই দশকজুড়ে বিস্তৃত এই ধারাবাহিকতা ফুটবল ইতিহাসেই বিরল।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল আরও একটি কারণে বিশেষ। মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপ আসরে খেলার কীর্তি গড়েন মেসি। ২০০৬ থেকে ২০২৬—টানা ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে তিনি গড়ে ফেলেছেন নতুন ইতিহাস।
শুধু তাই নয়, এই ম্যাচে গোল করে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে কম বয়সে এবং সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার অনন্য রেকর্ডের মালিকও হয়েছেন তিনি। ২০০৬ সালের ১৬ জুন সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গোল করে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ গোলদাতা হয়েছিলেন মেসি। ঠিক ২০ বছর পর, একই ১৬ জুনে তিনি হয়ে গেলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বয়স্ক বিশ্বকাপ গোলদাতা।
ফুটবল পরিসংখ্যান সংস্থা অপ্টার তথ্য অনুযায়ী, আলজেরিয়ার বিপক্ষে তার প্রথম গোলটি ছিল বিশ্বকাপে বক্সের বাইরে থেকে করা পঞ্চম গোল। এর মাধ্যমে তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রবার্তো রিভেলিনোর প্রায় ৬০ বছরের পুরোনো রেকর্ড। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে বক্সের বাইরে থেকে পাঁচ গোল করার কীর্তি আর কারও ছিল না।
জাতীয় দলের জার্সিতেও মেসির গোলসংখ্যা পৌঁছেছে ১২০-এ, যা আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অর্জন।
একসময় যাকে নিয়ে বলা হতো, জাতীয় দলের হয়ে তিনি হয়তো ক্লাব ফুটবলের সাফল্য পুনরাবৃত্তি করতে পারবেন না, সেই মেসিই এখন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অধিনায়কদের একজন। ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফাইনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা জয়ের পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত শুরু করলেন তিনি।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে বয়সকে যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। প্রতিটি ম্যাচে নতুন রেকর্ড, নতুন ইতিহাস আর নতুন বিস্ময় উপহার দিয়ে চলেছেন তিনি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক হয়তো ছিল বিশ্বকাপ অভিযানের প্রথম ধাপ, কিন্তু এই পারফরম্যান্স আবারও মনে করিয়ে দিল—লিওনেল মেসি শুধুই একজন ফুটবলার নন, তিনি ফুটবল ইতিহাসের এক চলমান মহাকাব্য।