
প্রতিনিধি 19 July 2026 , 11:43:16 প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসরের পর্দা নামবে আজ। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত একটায় ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। যেখানে বুটের প্রত্যেকটা স্পর্শে থাকবে মর্যাদার লড়াই। ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং গর্বের জন্য যুদ্ধ করবে একই ভাষাভাষীর দুই দেশ।
ফুটবলের নন্দকাননে আজ স্পেনের জ্যামিতিক মাপের নিখুঁত ও রাজকীয় পাসিংয়ের ‘টিকিটাকা’র বিপরীতে রাজপথের ধুলোবালি থেকে উঠে আসা আগ্রাসী ও আবেগপ্রবণ ‘লা নুয়েস্ট্রা’ দেখবে বিশ্ব। পাশাপাশি দুই ডাগআউটেও দেখা যাবে এমন দুজনকে, যাঁদের রণকৌশল ইস্পাত-দৃঢ়। অভিন্ন উদ্দেশ্য—জয়ের মিশনে একে অন্যের মুখোমুখি হবেন তাঁরা। মাঠে লড়বেন এমন সব ফুটবলার, যাঁরা একই ক্লাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিপক্ষের ফাঁদ নসাৎ করে দেন।
আজ ইউরোপের চ্যাম্পিয়নরা লড়বে লাতিন আমেরিকান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি মুখোমুখি হবেন ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামালের। আজ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ছক কষবেন লিওনেল স্কালোনির বিরুদ্ধে। আজ বিশ্বজুড়ে মিলিয়ন মিলিয়ন চোখের ঠিকানা হবে মেটলাইফের সবুজ গালিচায়। আজ চোখের পলক ফেলতে দেবে না লা মাসিয়া কিংবা আতলেতিকো মাদ্রিদের একাডেমি থেকে উঠে আসা আইকনিক গ্র্যাজুয়েটরা। প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি মুহূর্ত আবেগী করে তুলবে ফুটবলপ্রেমীদের। কাউকে কাঁদাবে, দেবে নখ কামড়ানো অনুভূতি। আজ ৯০ মিনিটের একটি সেকেন্ডও ফেলনা নয়, বরং স্মৃতির আলমারিতে যুগ যুগ জমা রাখার মতো খোরাক জোগাবে।
কে জিতবে ট্রফি? আর্জেন্টিনার জার্সিতে নতুন করে খোদাই হবে আরও একটি স্টার, নাকি দ্বিতীয়বার ট্রফি নিয়ে ঘরে ফিরবে স্পেন? এসবের উত্তরের জন্য না হয় ম্যাচের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে আজ রাতের লড়াইটি মূলত হবে চরম কৌশলের।

স্পেন বল পজেশন ধরে রেখে ছোট ছোট পাসে খেলতে ভালোবাসে, যা তারা এই টুর্নামেন্টেও ধরে রেখেছে। ৭ ম্যাচে তাদের গড় বল পজেশন ছিল ৬৩.৭ শতাংশ। এই কৌশল প্রতিপক্ষের জন্য শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। কারণ স্পেনের ফুটবলাররা নিখুঁত পাসের পসরা সাজিয়ে প্রতিপক্ষকে কেবল বলের পেছনেই ছোটায়। তবে তাদের কৌশল শুধু প্রতিপক্ষকে পিষে ফেলা বা ফাঁকা জায়গার জন্য অপেক্ষা করা নয়। স্পেনের মুভমেন্ট অত্যন্ত গতিশীল, যেখানে খেলোয়াড়রা ক্রমাগত পজিশন পরিবর্তন করেন এবং ডিফেন্সিভ লাইন ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন।
ফুল-ব্যাকদের ওভারল্যাপ করে ওপরে উঠে আসাটা স্পেনের জন্য দারুণ ফলপ্রসূ হয়েছে। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে পোরোর গোলটি ঠিক এভাবেই এসেছিল। অন্যদিকে অপজিট ফ্ল্যাঙ্কে মার্ক কুকুরেয়া আরও বেশি সক্রিয় ছিলেন, তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের পেছনে ১৩৯ বার রান নিয়েছেন—যা এই টুর্নামেন্টে যেকোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে পঞ্চম সর্বোচ্চ। এত বেশি আক্রমণ করা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষ দলগুলো এই মুভমেন্ট ট্র্যাক করতে বা কাকে মার্ক করবে, তা সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
বল দখলে রাখার প্রতি স্পেনের যে তীব্র ঝোঁক, ঠিক ততটাই তীব্র আগ্রহ বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও। লুইস দে লা ফুয়েন্তের ফরোয়ার্ডরা আক্রমণাত্মকভাবে প্রেসিং করেন। দুই সেন্টার-ব্যাক পাউ কুবারসি এবং আইমেরিক লাপোর্তে হাই-ডিফেন্সিভ লাইন ধরে রেখে মাঠের জায়গা ছোট করে ফেলেন এবং প্রতিপক্ষকে তাদের অর্ধে চেপে ধরেন। এই পুরো বিষয়টিকে সুতোয় বেঁধে রাখেন রদ্রি। প্রতিপক্ষের কাউন্টার-অ্যাটাকগুলো নস্যাৎ করতে তাঁর পজিশনাল সেন্সের জুড়ি মেলা ভার।
স্পেনের বিপরীতে আর্জেন্টিনার কৌশলগত দিকের কথা বলতে গেলে, ইংল্যান্ড সেমিফাইনালের শেষ দিকে যে ভুলটি করেছিল—যদি স্পেন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে রক্ষণাত্মক হয়ে বসে থাকেন, তবে তাদের মাঝমাঠে এত কোয়ালিটি আছে যে তারা সহজেই বল পাসে আধিপত্য করবে এবং একের পর এক সুযোগ তৈরি করবে। প্রতি-আক্রমণে গড়ে ৫.৪টি পাস দেওয়ার পরিসংখ্যানই বলে দেয় যে, তারা কতটা ঠাণ্ডা মাথায় সুযোগ তৈরি হওয়া পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে নাচাতে পারে।
এই কম্বিনেশনগুলো মূলত মিডফিল্ড কেন্দ্রিক, যেখানে সাধারণত মেসি ওঁৎ পেতে থাকেন। আর্জেন্টিনা অন্যান্য দলের তুলনায় উইং বা ফ্ল্যাঙ্ক ব্যবহার করে পাস দেওয়ার কাজটা বেশ কম করেছে। তিনিই দলের সবচেয়ে বড় তারকা। নিজে গোল পাচ্ছেন, না হয় সতীর্থদের দিয়ে করাচ্ছেন। মজার ব্যাপার হলো, আর্জেন্টিনার ১৯টি গোলের মধ্যে ১২টি গোলই এসেছে ম্যাচের ৭৫ মিনিটের পর।