
প্রতিনিধি 16 August 2026 , 11:11:45 প্রিন্ট সংস্করণ

‘রিখটার স্কেলে হিসেব করলে এটি রিখটার স্কেলের ওপরে চলে গেছে‘- ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে জয়ের পর এমন কথাই বলেছিলেন ধারাভাষ্যকার। প্রায় ২১ বছর পর বদলে গেছে অনেক কিছু। মাঝে অস্ট্রেলিয়াকে ঘরের মাঠে টেস্টেও হারিয়েছে বাংলাদেশ।
তবে এবার যা করে দেখাল নাজমুল হোসেন শান্তর দল, তা হয়তো দূর কল্পনায়ও ভাবেনি ক্রিকেট বিশ্ব। অস্ট্রেলিয়ার মাঠে গিয়ে অভিজাত টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো ধসিয়ে দিয়েই ইতিহাস গড়া এক জয় তুলে নিল বাংলাদেশ।
সিরিজ শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে বারবার ঘুরেফিরে অস্ট্রেলিয়ার মাঠ থেকে ‘সম্মান’ অর্জনের কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। শুধু সেই সম্মানই অর্জন করেনি তারা, প্রথম টেস্টে মাঠ ছেড়েছে দাপুটে এক জয় নিয়েই।
ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে মাত্র চার দিনের মধ্যে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশ। চতুর্থ দিন স্বাগতিকদের দেওয়া ৫৭ রানের লক্ষ্য সহজেই ছুঁয়ে ফেলেছে তারা।
এর আগে ম্যাচের প্রথম তিন দিনও একচ্ছত্র দাপট দেখায় শান্তর দল। প্রথম দিনে পেস বোলিংয়ের এক দুর্দান্ত প্রদর্শনীতে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয় তারা। পরে ব্যাট হাতে জ্বলে ওঠেন তানজিদ হাসান তামিম, শান্ত, মুমিনুল হকরা।

তৃতীয় দিন সকালে লেজের সারির ব্যাটারদের নিয়ে লড়াকু ইনিংস খেলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। যার সৌজন্যে ১৩৮ ওভার খেলে ৪২৬ রান করে বাংলাদেশ। গত সাড়ে ৭ বছরের মধ্যে সফরকারী কোনো দলের অস্ট্রেলিয়ার মাঠে এটিই সর্বোচ্চ ওভার খেলার রেকর্ড।
২২৮ রানের বিশাল লিডে চাপা পড়ার পর ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দেয় অস্ট্রেলিয়া। তবে চতুর্থ দিন প্রথম সেশনে ৩ উইকেট নিয়ে তাদের আরও চাপে ফেলে দেন মিরাজ। সেখান থেকে বাংলাদেশকে লক্ষ্য দিতে পারলেও, তা তাড়া করতে সমস্যা হয়নি বাংলাদেশের।
ছোট লক্ষ্যে শুরুটা অবশ্য মনমতো ছিল না। দ্বিতীয় ওভারে জশ হেজেলউডের বলে বোল্ড হয়ে যান আগের ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তামিম।

তবে এটিকে বড় বিপদ হতে দেননি সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। ইতিবাচক ব্যাটিংয়েই দলকে ধীরে ধীরে জয়ের কাছে নিয়ে যান দুই বাঁহাতি ব্যাটার।
৪ উইকেটে ১৬১ রান নিয়ে রোববারের খেলা শুরু করে অস্ট্রেলিয়া। দিনের শুরুতেই দারুণ ডেলিভারিতে অ্যালেক্স কেয়ারিকে কট বিহাইন্ড করেন মিরাজ। অফ স্টাম্প লাইনে পিচ করা ডেলিভারি বেরিয়ে যাওয়ার মুখে ব্যাটের বাইরের কানা ছুঁয়ে যায় ৩০ রান করা কেয়ারির।
তার বিদায়ে ভাঙে ৫৬ রানের পঞ্চম উইকেট জুটি। পুরো ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ জুটি এটি।
এরপর বাউ ওয়েবস্টারকেও টিকতে দেননি মিরাজ। অফ স্পিনারের জন্য স্বপ্নের মতোই এক ডেলিভারি করে অস্ট্রেলিয়ার পেস অলরাউন্ডারকে বোল্ড করেন তিনি। অফ স্টাম্প লাইনে পিচ করে সোজা যাওয়া ডেলিভারি ওয়েবস্টারের ডিফেন্স ভেদ করে নাড়িয়ে দেয় স্টাম্প।
দ্রুত দুই উইকেট হারানোর পর অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন একাই লড়তে থাকা ক্যামেরন গ্রিন। তবে এই জুটিকেও বড় হতে দেননি মিরাজ। ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে শর্ট লেগে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন কামিন্স।
মধ্যাহ্ন বিরতির আগে আর সাফল্য পায়নি বাংলাদেশ। অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ৩৬ রান যোগ করেন গ্রিন ও মিচেল স্টার্ক। বাংলাদেশের ২২৮ রানের লিড ছাপিয়ে উল্টো এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা।
তবে দ্বিতীয় সেশনের শুরুতে এই জুটিকে এগোতে দেননি তাসকিন আহমেদ। অফ স্টাম্পের বাইরের বল তাড়া করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন ৩৪ বলে ১৮ রান করা স্টার্ক।
একপ্রান্তে সঙ্গীদের হারাতে থাকলেও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে চমৎকার সেঞ্চুরি করেন গ্রিন। ১৯২ বলে ৪ চার ও ১ ছক্কায় ক্যারিয়ারের তৃতীয় ও অস্ট্রেলিয়ার মাঠে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি করেন পেস বোলিং অলরাউন্ডার।
তিন অঙ্ক ছোঁয়ার পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি গ্রিন। নতুন স্পেলে ফিরে পঞ্চম বলে তাকে বোল্ড করে দেন হাসান। ম্যাচে এটি ছিল তার নবম উইকেট। গ্রিনের বিদায়ে জয়ের সুবাস পেতে শুরু করে বাংলাদেশ।
পরে নাথান লায়নকে এলবিডব্লিউ করে নিজের ৫ উইকেট পূর্ণ করার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস গুটিয়ে দেন মিরাজ। টেস্ট ক্রিকেটে এটি তার ১৫তম ৫ উইকেট। যার সৌজন্যে বাংলাদেশের সামনে আসে মামুলি লক্ষ্য। পরে অনায়াসেই জিতে যায় তারা।