
প্রতিনিধি 13 June 2026 , 11:30:34 প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে ডিবি পরিচয়ে মারধর ও হেনস্তার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (১২ জুন) রাত সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর লালখানবাজার ফ্লাইওভারের মুখে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। নিজের খেলোয়াড়সুলভ পরিচয় ও আইডি কার্ড দেখানোর পরও তাকে রেহাই দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন ২৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
ঢাকা থেকে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ খেলে শুক্রবার রাতে বিমানে করে চট্টগ্রামে পৌঁছান নাঈম। ফ্লাইট বিলম্ব হওয়ায় রাত ১১টার পর তিনি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নিজ বাসায় ফিরছিলেন। রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে লালখানবাজার ফ্লাইওভারের নিচে পৌঁছালে কতিপয় ব্যক্তি তাদের সিএনজি থামিয়ে চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নেয়।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে কান্নারত কণ্ঠে নাঈম হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি পুলিশকে বললাম, ‘প্রয়োজনে আপনারা আমার ব্যাগ চেক করেন’। কিন্তু তারা আকস্মিক আমার গলা চিপে ধরে বলল-‘তুই গাড়িতে উঠ’। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম আমার গলা চিপে ধরা হচ্ছে কেন এবং ধাক্কা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলাম। এরপর তারা আমাকে পাইপ ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর এবং হেনস্তা শুরু করে।”
নাঈম হাসানের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে দুজন পোশাকধারী পুলিশ সদস্য এবং একজন পাঞ্জাবি পরা সাদা পোশাকের ব্যক্তি ছিলেন। সাদা পোশাকের ওই ব্যক্তিটি মূলত পুলিশের ‘সোর্স’ বা তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করছিলেন।
জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, “পাঞ্জাবি পরা ওই লোকটা কোনো পরিচয় না দিয়ে আমাকে পাইপ দিয়ে মারছিল। পরবর্তীতে সেখানে প্রায় ১০০-২০০ মানুষ জড়ো হয়ে আমার ক্রিকেটার পরিচয় দিলেও তারা মারধর থামায়নি। তারা বলছিল- ‘তুমি আসামি, কথা বলবে না’। আমি আমার আইডি কার্ড বের করে দেখানোর পরও তারা আমাকে লাঠি দিয়ে মারে।”
পরবর্তীতে নাঈমকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে খুলশি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। থানায় পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত কর্মকর্তারা তাকে ক্রিকেটার হিসেবে শনাক্ত করেন। বর্তমানে নাঈম চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে নিজ বাসায় অবস্থান করছেন।

থানা থেকে মোবাইল ফোন হাতে পাওয়ার পরপরই নাঈম হাসান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তামিম ইকবাল তাৎক্ষণিকভাবে খুলশি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং নাঈমের বাবার সঙ্গে কথা বলেন এবং এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন।
জাতীয় দলের এই ক্রিকেটারের দাবি– ‘পুলিশের গাড়ি তো ছিল সেখানে। গাড়িতে না তুলে সিএনজিতে করে আমাকে কই নিয়ে যাইতো?.. আমার জায়গায় যদি সাধারণ মানুষ হইতো আপনারা কেউ আসতেন না, একশ-দেড়শ মানুষ কোশ্চেন করতো না। পুলিশের হাতে যদি মানুষ সেইফ না থাকে তাহলে আর লাভ কী!’
সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়ে নাঈম হাসান বলেন, “পুলিশের হাতে যদি মানুষ নিরাপদ না থাকে, তাহলে আর লাভ কী? আজকে আমি ক্রিকেটার বলে আপনারা (গণমাধ্যম) এসেছেন, মানুষ প্রশ্ন করেছে। আমার জায়গায় কোনো সাধারণ মানুষ হলে কেউ আসত না। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
এই ঘটনা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আমিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ওনি (নাঈম হাসান) ন্যায় বিচার পাবেন। আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। পুলিশ সদস্য যেই হোক না কেন, আমরা এই ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। কারণ এটার সঙ্গে পুলিশের ইমেজ জড়িত। আমরা নতুন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্নে কাজ করতেছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো কিছুই টলারেট করব না।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, মূলত চোরাচালান সংক্রান্ত একটি তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সদস্যরা সেখানে অভিযানে গিয়েছিলেন। তবে তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং অভিযান যথাযথ নিয়ম মেনে হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা কোনো অনিয়ম সহ্য করব না। তা ছাড়া, আমাদের পুলিশিং প্রক্রিয়ায় কাউকে মারধর করার কোনো সুযোগ নেই।’
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাংশের এমন অপেশাদার ও সহিংস আচরণ দেশের ক্রীড়াঙ্গনসহ সাধারণ মহলে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। একটি দেশের জাতীয় দলের তারকারাই যদি প্রকাশ্য রাস্তায় এমন হেনস্তার শিকার হন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়—এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।