
প্রতিনিধি 12 June 2026 , 4:09:22 প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ জেতা মেক্সিকোর জন্য যেন বহু দিনের এক অসম্ভব কাজ ছিল। আগের সাতবার সেই দরজা খুলতে পারেনি তারা। এবার এস্তাদিও আসতেকায় সেই পুরোনো ভার নামিয়ে দিলেন হুলিয়ান কিনিওনেস। আর দ্বিতীয়ার্ধে রাউল হিমেনেসের হেড মেক্সিকোকে এনে দিল পূর্ণ স্বস্তি।
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হলো মেক্সিকোর ২-০ গোলের জয় দিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট নয়, স্বাগতিক দেশের জন্য এক মানসিক মুক্তিও। প্রায় ১৩ কোটি মানুষের প্রত্যাশা, ঘরের মাঠের চাপ, উদ্বোধনী ম্যাচের স্নায়ু সবকিছুর ভেতর দিয়েই হাভিয়ের আগিররের দল নিজেদের কাজটি করে ফেলল।
এস্তাদিও আসতেকাকে আধুনিক, আরামদায়ক বা সহজে পৌঁছানো যায় এমন ভেন্যু বলা যাবে না। কিন্তু এই মাঠের দিকে তাকালেই ফুটবলের ইতিহাস চোখে পড়ে। পেলে, ম্যারাডোনা, ১৯৭০, ১৯৮৬—আসতেকা শুধু কংক্রিটের গ্যালারি নয়, বিশ্বকাপের স্মৃতির ঘর। সেই ঘরেই এবার আবার ফিরে এলো ফুটবলের আসল আবেগ।
উদ্বোধনের আগে অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, মেক্সিকো সিটির যানজট, প্রতিবাদ, টিকিটের দাম ও নিরাপত্তা নিয়ে শুরুটা বিশৃঙ্খল হতে পারে। কিন্তু ম্যাচের রাতে সেই আশঙ্কা অনেকটাই দূরে সরে যায়। গ্যালারিতে ছিল সমর্থকের ঢেউ, মাঠে ছিল সংগঠিত আয়োজন, আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল সংক্ষিপ্ত ও সুন্দর।
মেক্সিকোর শুরুটাও ছিল তেমনই সরাসরি। ড্রেসিংরুম থেকে যেন স্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়েই বেরিয়েছিল আগিররের দল। প্রথম মিনিট থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিজেদের অর্ধে চেপে ধরে তারা। পাঁচ মিনিটে রাউল হিমেনেস প্রায় গোল পেয়েই যাচ্ছিলেন, কিন্তু রনওয়েন উইলিয়ামস দারুণ সেভে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বাঁচান।
তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ৯ মিনিটে দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগের ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডআপ শাস্তি পায়। স্পেফেলো সিথোলে বল হারান, কিনিওনেস বল নিয়ে ভেতরে ঢোকেন এবং নিচু শটে উইলিয়ামসের পায়ের ফাঁক দিয়ে জালে পাঠান। ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম গোল, মেক্সিকোর প্রথম স্বস্তি।
গোলের পর আসতেকা বিস্ফোরিত হয়। কিন্তু মেক্সিকো থামেনি। কিনিওনেস বারবার দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্সকে অস্বস্তিতে ফেলেছেন। সৌদি ক্লাব আল কাদসিয়া খেলা এই ফরোয়ার্ডের গতিশীলতা, শক্তি ও সরাসরি গোলমুখী খেলা দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমার্ধে তার দ্বিতীয় গোলও হয়ে যেতে পারত। ব্রায়ান গুতিয়েরেসের পাস থেকে ভেতরে ঢুকে নেওয়া তার শট পোস্টে লাগে। উইলিয়ামস তখন শুধু তাকিয়ে ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষকই ছিলেন তাদের সেরা খেলোয়াড়। তার কয়েকটি সেভ না থাকলে প্রথমার্ধেই ম্যাচ অনেকটা মেক্সিকোর হাতে চলে যেতে পারত।
দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমার্ধে আক্রমণে প্রায় কিছুই করতে পারেনি। প্রথম উল্লেখযোগ্য চেষ্টা আসে অনেক দেরিতে, সেটিও খুব বেশি বিপজ্জনক ছিল না। মেক্সিকোর মাঝমাঠে আলভারো ফিদালগো, এরিক লিরা ও ব্রায়ান গুতিয়েরেস ছন্দ ধরে রাখেন। বিশেষ করে গুতিয়েরেসের নড়াচড়া ও পাসিং দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণকে বারবার ছিন্ন করেছে।

তবু বিরতিতে ১-০ ব্যবধান মেক্সিকোর জন্য পুরো সন্তুষ্টির ছিল না। কারণ সুযোগ ছিল আরও। রবার্তো আলভারাদো একবার হিমেনেসকে খুঁজে না নিয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নেন, যা সহজ পথে দ্বিতীয় গোল এনে দিতে পারত। বড় ম্যাচে এমন সুযোগ নষ্ট করা পরে বিপদ ডেকে আনতে পারে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মেক্সিকো আবার চাপ বাড়ায়। ফিদালগো প্রায় গোল পেয়ে যাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর কিনিওনেস আসতেকার রাতকে আরও নাটকীয় করে তুলতে চাইলেন। প্রায় ৪০ মিটার দূর থেকে নেওয়া তার শট সামলান উইলিয়ামস।
এরপর ম্যাচ আরও কঠিন হয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য। ৫০ মিনিটে স্পেফেলো সিথোলে লাল কার্ড দেখেন। শেষ ডিফেন্ডার হিসেবে গুতিয়েরেসকে ফাউল করায় রেফারি তাকে সরাসরি মাঠের বাইরে পাঠান। প্রথম গোলের আগে ভুলের সঙ্গে যুক্ত থাকা সিথোলের জন্য রাতটি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
একজন বেশি নিয়ে খেলার সুবিধা কাজে লাগিয়ে মেক্সিকো ধীরে ধীরে আরও নিয়ন্ত্রণ নেয়। ৬৬ মিনিটে আসে সেই গোল, যা আসতেকায় পূর্ণ স্বস্তি এনে দেয়। আলভারাদোর নিখুঁত ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে গোল করেন রাউল হিমেনেস। একজন সেন্টার ফরোয়ার্ডের ঠিক যা করার কথা, হিমেনেস সেটাই করেছেন—সঠিক জায়গায় থাকা, সঠিক সময়ে বল আক্রমণ করা, আর সুযোগ শেষ করা।
এই গোলের উৎসেও ছিলেন কিনিওনেস। প্রথম গোলের নায়ক, দ্বিতীয় গোলের আক্রমণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তার রাত তাই শুধু গোলদাতার নয়, ম্যাচের চরিত্র বদলে দেওয়া ফুটবলারের।
শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপর্যয় আরও বাড়ে। থেম্বা জোয়ানে লাল কার্ড দেখেন। ৯ জনের দক্ষিণ আফ্রিকার আর ফেরার বাস্তব সুযোগ ছিল না।
তবে ম্যাচের শেষ অংশে মেক্সিকোর রাতেও একটি দাগ পড়ে। ইনজুরি সময়ে সেসার মন্তেসও লাল কার্ড দেখেন। সামগ্রিকভাবে মেক্সিকোর পারফরম্যান্স যতটা নিয়ন্ত্রিত ও আত্মবিশ্বাসী ছিল, এই লাল কার্ড সেটিকে সামান্য হলেও অসম্পূর্ণ করে রাখল।
এই ম্যাচে রেফারিংয়ের কয়েকটি দিকও চোখে পড়েছে। সেট-পিসে ব্লকিং বা শরীর দিয়ে পথ আটকে দেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে রেফারি শুরু থেকেই কঠোর ছিলেন। সাম্প্রতিক ফুটবলে এই কৌশল অনেক বেড়েছে। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সেই জায়গায় পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হলো। ভিএআর ব্যবহারের গতিও ছিল ভালো, সঙ্গে মাঠে সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যার নতুন ধারাও দর্শকের অভিজ্ঞতাকে কিছুটা পরিষ্কার করেছে।
মেক্সিকোর জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন, তারা মুহূর্তের ভারে ভেঙে পড়েনি। ঘরের মাঠ, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, গ্যালারির প্রত্যাশা—এসব অনেক সময় দলকে আটকে দেয়। কিন্তু আগিররের দল শুরু থেকেই জানত কী করতে হবে। তারা দল হিসেবে প্রেস করেছে, দল হিসেবে আক্রমণ করেছে, দল হিসেবে উদ্যাপন করেছে।
আগিররের জন্য রাতটি আরও ব্যক্তিগত। ৪০ বছর আগে একই আসতেকায় তিনি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে খেলেছিলেন ফুটবলার হিসেবে। এবার স্যুট পরে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে তিনি সেই পুরোনো স্মৃতির নতুন অধ্যায় লিখলেন। তার দল মেক্সিকোকে শুধু জয় দেয়নি, এক ধরনের মুক্তিও দিয়েছে।
এই মেক্সিকো কতদূর যাবে, তা এখনই বলা যায় না। কিন্তু প্রথম ম্যাচে তারা যা দেখিয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ সামলানোর ক্ষমতা, মাঝমাঠের সমন্বয়, আক্রমণে সরাসরি ভাবনা এবং গ্যালারির আবেগকে শক্তিতে বদলে দেওয়ার দক্ষতা।