
প্রতিনিধি 12 June 2026 , 4:57:06 প্রিন্ট সংস্করণ

লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এক প্রজন্মের ফুটবল কল্পনাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেওয়া দুই নাম। ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য ট্রফি, ব্যক্তিগত পুরস্কারের পাহাড়, গোলের রেকর্ড, শ্রেষ্ঠত্বের অন্তহীন বিতর্ক—সবই আছে তাদের ক্যারিয়ারে। তবু বিশ্বকাপের গল্পে দুজনের পথ দীর্ঘদিন ছিল অপূর্ণতার।
২০২২ কাতারে মেসি সেই অপূর্ণতা ঘুচিয়েছেন। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শূন্যস্থান পূরণ করেছেন তিনি। রোনালদো এখনো সেই ট্রফির অপেক্ষায়। ২০২৬ বিশ্বকাপে দুজনই খেলছেন নিজেদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, আর সম্ভবত শেষবারের মতো একই আসরে।
কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রায় তাদের সামনে বারবার দাঁড়িয়েছে কিছু দল। কেউ পেনাল্টিতে, কেউ নকআউটে, কেউ ফাইনালে, কেউ গ্রুপ পর্বেই থামিয়ে দিয়েছে মেসি বা রোনালদোর বিশ্বকাপ-স্বপ্ন।
২০০৬: শুরুতেই জার্মানি ও ফ্রান্সের বাধা
২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপ ছিল মেসি ও রোনালদো দুজনেরই প্রথম বিশ্বকাপ। তখন তারা বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ, এখনকার মতো ইতিহাসের দুই মহাশক্তি নন।
মেসির আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্বাগতিক জার্মানির। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় শেষে ম্যাচ যায় টাইব্রেকারে। সেখানে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। তরুণ মেসির প্রথম বিশ্বকাপ শেষ হয় বেঞ্চে বসে, অসহায় দর্শক হয়ে।
রোনালদোর পর্তুগাল সেবার আরও এক ধাপ এগিয়েছিল। সেমিফাইনালে তাদের সামনে ছিল জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স। মিউনিখে জিদানের পেনাল্টি গোলই পর্তুগালের ফাইনাল স্বপ্ন শেষ করে দেয়। রোনালদোর প্রথম বিশ্বকাপ শেষ হয় সেমিফাইনালের হতাশায়।
২০১০: আবার জার্মানি, আর রোনালদোর সামনে স্পেন
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ছিল মেসির জন্য বড় ধাক্কা। দিয়েগো ম্যারাডোনার কোচিংয়ে আর্জেন্টিনা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়। মেসি পুরো টুর্নামেন্টে গোল পাননি, আর জার্মানি হয়ে ওঠে তার বিশ্বকাপের প্রথম বড় দুঃস্বপ্ন।
রোনালদোর পর্তুগালও সেবার শেষ ষোলোতেই থেমে যায়। প্রতিপক্ষ ছিল স্পেন। ডেভিড ভিয়ার গোল পর্তুগালকে বিদায় করে দেয়। সেই স্পেনই পরে বিশ্বকাপ জেতে। রোনালদোর জন্য সেটি ছিল এমন এক আসর, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত আলো দলকে দূরে নিয়ে যেতে পারেনি।
২০১৪: মেসির সবচেয়ে কাছে গিয়ে হার, রোনালদোর গ্রুপ পর্বের বিদায়
২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি। আর্জেন্টিনা একের পর এক ধাপ পেরিয়ে ফাইনালে ওঠে। মেসি ছিলেন দলের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ফাইনালে আবার সেই জার্মানি।
মারাকানায় নির্ধারিত সময়ে গোল হয়নি। অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটজের গোল আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে দেয়। মেসি গোল্ডেন বল জেতেন, কিন্তু বিশ্বকাপ নয়। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪—তিন বিশ্বকাপে তিনবার জার্মানিই মেসির আর্জেন্টিনাকে থামায়।

অন্যদিকে রোনালদোর পর্তুগালের জন্য ২০১৪ ছিল হতাশার। জার্মানির কাছে বড় হার দিয়ে শুরু, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ড্র, ঘানার বিপক্ষে জয়—সব মিলিয়েও গোল ব্যবধানে গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি তারা। কোনো একক নকআউট ম্যাচ নয়, পুরো গ্রুপটাই রোনালদোর বিশ্বকাপ শেষ করে দেয়।
২০১৮: একই দিনে দুই মহাতারকার বিদায়
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ মেসি ও রোনালদোর জন্য ছিল আরেকটি বেদনাদায়ক আসর। দুজনই শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেন।
আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্সের। কাজানে সেই ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপ্পের গতি আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় মেসির দল। পরে ফ্রান্সই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
রোনালদোর পর্তুগালের সামনে ছিল উরুগুয়ে। এডিনসন কাভানির দুই গোলে ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় পর্তুগাল। সেদিন রোনালদো গোল পাননি। পর্তুগালের ইউরো-জয়ী প্রজন্ম বিশ্বকাপে আবারও থেমে যায়।
২০২২: মেসির মুক্তি, রোনালদোর মরক্কো-দুঃস্বপ্ন
২০২২ কাতার বিশ্বকাপই একমাত্র আসর, যেখানে মেসি আর বিদায়ের গল্পের নায়ক নন। বরং তিনি বিশ্বজয়ের গল্পের কেন্দ্র। সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে শুরু করেও আর্জেন্টিনা ঘুরে দাঁড়ায়। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে মেসি জেতেন সেই ট্রফি, যার অপেক্ষায় ছিলেন পুরো ক্যারিয়ার।
কিন্তু রোনালদোর গল্প ছিল উল্টো। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। বদলি হিসেবে নামা রোনালদো ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মরক্কো হয়ে ওঠে তাঁর বিশ্বকাপ জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রতিপক্ষগুলোর একটি।
এক নজরে মেসি-রোনালদোকে যারা থামিয়েছে
বিশ্বকাপ মেসির আর্জেন্টিনাকে থামিয়েছে রোনালদোর পর্তুগালকে থামিয়েছে
২০০৬ জার্মানি ফ্রান্স
২০১০ জার্মানি স্পেন
২০১৪ জার্মানি গ্রুপ পর্ব
২০১৮ ফ্রান্স উরুগুয়ে
২০২২ কেউ নয়, আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন মরক্কো
এই তালিকায় মেসির জন্য সবচেয়ে বড় নাম জার্মানি। তিনটি বিশ্বকাপে তারা আর্জেন্টিনাকে বিদায় করেছে। রোনালদোর ক্ষেত্রে একক কোনো দুঃস্বপ্নের দল নেই, কিন্তু স্পেন, উরুগুয়ে ও মরক্কোর কাছে তার বিশ্বকাপ-স্বপ্ন বড় ধাক্কা খেয়েছে।
২০২৬: শেষবার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা?
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় কল্পনাগুলোর একটি—মেসি বনাম রোনালদো কি বিশ্বকাপে কখনো মুখোমুখি হবে? এত দীর্ঘ ক্যারিয়ারেও দুজন কখনো বিশ্বকাপে একে অপরের বিপক্ষে খেলেননি।
এবার সেই সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। নতুন ৪৮ দলের ফরম্যাটে নকআউট পর্ব শুরু হবে শেষ ৩২ দিয়ে। গ্রুপের ফল, তৃতীয় সেরা দলের হিসাব এবং নকআউট ব্র্যাকেটের পথ মিললে মেসি ও রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ দ্বৈরথ দেখা যেতে পারে।
তবে সম্ভাবনা যতই রোমাঞ্চকর হোক, দুজনের সামনে আগে গ্রুপ পর্বের বাস্তবতা। মেসির আর্জেন্টিনা এসেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে। রোনালদোর পর্তুগাল এসেছে সেই একমাত্র বড় ট্রফির খোঁজে, যা তার ক্যারিয়ারে নেই।
মেসি একবার বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছেন। রোনালদো এখনো অপেক্ষায়। ২০০৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত বহু দল তাদের পথ আটকে দিয়েছে। ২০২৬-এ প্রশ্ন একটাই—আরেকটি দল কি আবার তাদের কারও শেষ বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভাঙবে, নাকি ইতিহাস এবার নতুন সমাপ্তি লিখবে?