
প্রতিনিধি 3 June 2026 , 4:08:36 প্রিন্ট সংস্করণ

বাগেরহাটের বিশ্ব ঐতিহ্য হযরত খানজাহান আলী (র:) এর মাজার সংলগ্ন দিঘির একমাত্র এবং সর্বশেষ মাদ্রাজি কুমিরটিকে অবশেষে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বুধবার (৩ জুন) দুপুরে জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে দীঘির পূর্ব পাড় থেকে কুমিরটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তাদের একটি বিশেষ দল। পরে সেটিকে খুলনার কয়রা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসান ঘটল খানজাহান দীঘির শত শত বছরের ঐতিহাসিক ‘কুমির অধ্যায়’-এর।
গত সোমবার রাতে খানজাহান আলী মাজার দীঘির ঘাটে গোসল করতে নেমে কুমিরের আক্রমণের শিকার হয় ৮ বছর বয়সী শিশু ফাতেমা আক্তার। কুমিরটি শিশুটিকে পানির নিচে টেনে নিয়ে যাওয়ার দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা পর দীঘির মহিলা ঘাট এলাকা থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর মাজার এলাকায় আগত দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়ে ঘটনার পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবার রাতে বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় দীঘির হিংস্র হয়ে ওঠা একমাত্র মাদ্রাজি কুমিরটিকে অবিলম্বে অপসারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভা শেষে জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন সাংবাদিকদের জানান, মাজার প্রাঙ্গণে আগত দর্শনার্থীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীঘির কুমিরটিকে সাময়িকভাবে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি মাজার এলাকায় পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করা হবে।

মাজারের ইতিহাস অনুযায়ী, শত শত বছর ধরে এই দীঘিতে সুলতানুল আউলিয়া হযরত খানজাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত আদি কুমির ‘কালাপাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’-এর বংশধরেরা বসবাস করে আসছিল। তবে প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা ও নানা কারণে একপর্যায়ে আদি বংশের কুমিরগুলো সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
পরবর্তীতে দীঘির ঐতিহ্য ধরে রাখতে ২০০৫ সালে ভারত সরকার উপহার হিসেবে ৬টি মিঠা পানির মাদ্রাজি কুমির বাংলাদেশে পাঠায়, যা এই দীঘিতে অবমুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু আদি কুমিরদের সঙ্গে ভারতীয় কুমিরগুলোর অঞ্চলের লড়াইয়ে বেশ কয়েকটি কুমির মারা যায় এবং আহত দুটিকে সুন্দরবনের করমজলে পাঠানো হয়। এরপর থেকে এই একটিমাত্র পুরুষ মাদ্রাজি কুমিরই দিঘিতে রাজত্ব করে আসছিল।
বুধবার দুপুরে বন বিভাগের একটি বিশেষজ্ঞ দল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দীঘির পূর্ব পাড়ে ফাঁদ পেতে ও জাল ব্যবহার করে কুমিরটিকে কাবু করে। পরে সেটিকে নিরাপদ খাঁচায় বন্দি করে কয়রা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।
বন বিভাগ ও মাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, এই কুমিরটি চলে যাওয়ার পর বিশাল এই ঐতিহাসিক দিঘিটি এখন সম্পূর্ণ কুমির শূন্য। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও, মাজারের প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা একটি জীবন্ত ঐতিহ্যের এভাবে অবসান ঘটায় স্থানীয় বাসিন্দা ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্ত-দর্শনার্থীদের মনে এক দীর্ঘশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে।
মাজারের প্রধান খাদেম তারিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঐতিহাসিক খানজাহান দীঘিতে কুমিরের ঐতিহ্য ধরে রাখা যেমন প্রয়োজন, তার চেয়ে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দীঘিতে থাকা একমাত্র কুমিরটি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে এবং বিভিন্ন সময় মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ওপর আক্রমণ করছে।’
খুলনা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, বাগেরহাট জেলা প্রশাসন ও মাজার কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কুমিরটিকে আপাতত বন বিভাগের হেফাজতে নেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনা হয়েছে। পরবর্তীতে কুমিরটিকে কোথায় রাখা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।