
প্রতিনিধি 6 July 2026 , 3:19:13 প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আজ রাতে মুখোমুখি হবে ইউরোপের ফুটবল পরাশক্তি পর্তুগাল ও স্পেন। আইবেরিয়ান উপদ্বীপের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দু’দলের এই লড়াই শুধু নকআউট পর্বের একটি ম্যাচই নয়, বরং এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় দ্বৈরথও। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, পরিসংখ্যান এবং দলীয় ভারসাম্য সবকিছু বিবেচনায় স্পেনকে এগিয়ে রাখছে অপটা সুপার কম্পিউটার। তবে নকআউটের মঞ্চে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোদের অবহেলা করার সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অপটার ২৫ হাজার প্রাক-ম্যাচ সিমুলেশনে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ৪৮.৬ শতাংশ। পর্তুগালের সম্ভাবনা ২৫.৬ শতাংশ, আর ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সম্ভাবনা ২৫.৮ শতাংশ।
শেষ ষোলোতে ওঠার পথটা অবশ্য দু’দলের ছিল ভিন্ন। রবার্তো মার্টিনেজের পর্তুগালকে শেষ পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে রীতিমতো নাটকীয় লড়াই করেই জয় নিশ্চিত করতে হয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে গঞ্জালো রামোসের গোল, বিতর্কিত একটি ভিএআর সিদ্ধান্ত এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে প্রথম গোল সব মিলিয়ে রোমাঞ্চকর এক ম্যাচ জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে পর্তুগিজরা।
সেই জয়ের পর এবার তাদের লক্ষ্য টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা। এর আগে ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দুটি নকআউট ম্যাচ জিতেছিল পর্তুগাল। এরপর আর সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি দলটি।
তবে এবার তাদের সামনে রয়েছে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ছন্দে থাকা স্পেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে চারটি ম্যাচ খেলেও একটিও গোল হজম করেনি। শেষ ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে তারা শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে। ওই ম্যাচে জোড়া গোল করেন মিকেল ওইয়ারসাবাল, অন্য গোলটি আসে পেদ্রো পোরোর পা থেকে।
স্পেনের এই রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা নতুন এক ইতিহাসের সামনে দাঁড় করিয়েছে দলটিকে। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর বিপক্ষে গোলশূন্য ম্যাচটিও হিসাব করলে, পর্তুগালের বিপক্ষেও যদি ক্লিন শিট রাখতে পারে, তবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা ছয়টি ম্যাচে কোনো গোল না খাওয়া প্রথম দল হবে স্পেন।

শুধু রক্ষণ নয়, সামগ্রিক পারফরম্যান্সেও দুর্দান্ত স্পেন। লা রোজা বর্তমানে টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত। এই ম্যাচেও হার এড়াতে পারলে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে গড়া নিজেদের দীর্ঘতম ৩৫ ম্যাচের অপরাজিত থাকার রেকর্ড স্পর্শ করবে তারা। ইউরোপীয় দলগুলোর মধ্যে ইতালি ছাড়া আর কোনো দল এর চেয়ে দীর্ঘ সময় অপরাজিত থাকতে পারেনি।
কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও গড়ছেন অনন্য এক রেকর্ড। তার অধীনে বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে স্পেন প্রথম ১১টি ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে। পর্তুগালকে হারাতে পারলে তিনি আইমে জাকে ও লুই ফন গালের পর তৃতীয় কোচ হিসেবে বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে প্রথম ১২ ম্যাচে অপরাজিত থাকার কীর্তি গড়বেন।
পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ভরসা অবশ্যই অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। স্পেনের বিপক্ষে তার চারটি গোল রয়েছে, যা এই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যেকোনো ফুটবলারের যৌথ সর্বোচ্চ। ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে তার স্মরণীয় হ্যাটট্রিক এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। অন্যদিকে স্পেনের আক্রমণের নেতৃত্বে থাকা মিকেল ওইয়ারসাবালও রয়েছেন দুর্দান্ত ছন্দে। এবারের বিশ্বকাপে চার গোল করে তিনি ২০১০ সালে ডেভিড ভিয়ার পাঁচ গোলের পর এক আসরে স্পেনের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় উঠে এসেছেন।
দুই দলের সাম্প্রতিক মুখোমুখি লড়াইও ম্যাচটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে পাঁচবার দেখা হয়েছে তাদের। দু’দলই একটি করে ম্যাচ জিতেছে, বাকি তিনটি ড্র হয়েছে। সর্বশেষ বিশ্বকাপে ২০১৮ সালে দু’দলের লড়াই ৩-৩ গোলে ড্র হয়েছিল, যেখানে হ্যাটট্রিক করেছিলেন রোনালদো। আর ইউরো ২০১২-এর সেমিফাইনালে গোলশূন্য ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে জিতে ফাইনালে উঠেছিল স্পেন।
তবে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের সামগ্রিক পরিসংখ্যান স্পেনের পক্ষেই। শেষ ১২ প্রতিযোগিতামূলক সাক্ষাতে পর্তুগাল জিতেছে মাত্র একবার, সেটিও ২০০৪ সালের ইউরোতে। যদিও সর্বশেষ সাক্ষাতে, ২০২৫ সালের নেশনস লিগের ফাইনালে টাইব্রেকারে স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল, যা এই ম্যাচের আগে রোনালদোদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে।
পরিসংখ্যান, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স ও ধারাবাহিকতায় স্পেন এগিয়ে থাকলেও, নকআউট ফুটবলে একটি মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের গল্প। তাই ডালাসের আইবেরিয়ান ডার্বিতে কে শেষ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করবে, সেই উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়েই।