
প্রতিনিধি 20 June 2026 , 3:40:55 প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড়, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক, সফল কোচ ও ক্রীড়া সংগঠক আবদুস সাদেক আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শনিবার (২০ জুন) সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দেশের হকি, ফুটবল ও ক্রীড়া প্রশাসনে অসামান্য অবদান রেখে যাওয়া এই ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে সমগ্র ক্রীড়াঙ্গনে।
মরহুমের প্রথম জানাজা আজ বাদ আসর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের বায়তুস সোবহান জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দ্বিতীয় জানাজা আগামীকাল রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বনানীর ওল্ড ডিওএইচএস মাঠে অনুষ্ঠিত হবে।
উল্লেখ্য, আবদুস সাদেকের ছোট ভাই দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। এছাড়াও মরহুমের বড় ছেলে ইশতিয়াক সাদেক, যিনি টি স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
আবদুস সাদেক শুধু অবিভক্ত পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের তারকা খেলোয়াড়ই ছিলেন না, তিনি ফুটবল, ক্রিকেটসহ আরও অনেক ক্রীড়া ইভেন্টে ছিলেন পারদর্শী। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রথম ফুটবল অধিনায়ক ও হকি অধিনায়ক ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের ক্রীড়ায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন। তার বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান ব্রিটিশ আমলে দেশের অন্যতম খ্যাতনামা সাঁতারু ছিলেন।

পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের সদস্য হিসেবে আবদুস সাদেক ১৯৬৯ সালে দেড় মাসব্যাপী ইউরোপ সফরে অংশ নেন। ওই সফরে জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডে খেলেন তিনি। ফেরার পথে মিসরের বিপক্ষেও একটি ম্যাচে অংশ নেন। ইউরোপ সফরে মাঠের দুর্দান্ত নৈপুণ্যের কারণে দ্রুতই আলোচনায় উঠে আসেন এই হকি তারকা।
স্বাধীনতার পর জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে ১৯৭৩ সালে কুমিল্লা জেলা দলের অধিনায়ক ছিলেন সাদেক।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে ১৯৭৭ সালে আবাহনীর কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি এবং প্রথম মৌসুমেই ইতিহাস গড়েন। তার অধীনে সেই লিগে কোনো ম্যাচে হারেনি আবাহনী। তিনটি ড্র ছাড়া বাকি সব ম্যাচে জয় পেয়ে ক্লাবটি বাংলাদেশের প্রথম অপরাজিত ফুটবল চ্যাম্পিয়ন হিসেবে অনন্য রেকর্ড গড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই ছিল কোনো দলের প্রথম অপরাজিত লিগ শিরোপা জয়।
কোচিংয়ের দায়িত্ব ছাড়ার পর ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করেন আবদুস সাদেক। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রচেষ্টাতেই ১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় এশিয়া কাপ হকি। যদিও ওই আসরের আয়োজক হওয়ার কথা ছিল জাপানের। এশিয়ান হকি ফেডারেশনের বৈঠকে তার উপস্থাপনা ও উদ্যোগে মুগ্ধ হয়ে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইরানের সমর্থনে আয়োজক হওয়ার সুযোগ পায় বাংলাদেশ।
১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে দেশের প্রথম জাতীয় হকি দল গঠিত হলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন আবদুস সাদেক। সেই সিরিজে বাংলাদেশ একটি ম্যাচ জেতে, একটি ড্র করে এবং একটি ম্যাচে পরাজিত হয়। পরে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের প্রথম এশিয়ান গেমস অংশগ্রহণেও হকি দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বাংলাদেশের হকি ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম আবদুস সাদেক। খেলোয়াড়, কোচ ও সংগঠক—তিন ভূমিকাতেই তিনি রেখে গেছেন অনন্য অবদান, যা দেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।