
প্রতিনিধি 7 March 2026 , 11:14:43 প্রিন্ট সংস্করণ

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৮৭–৯ উড়োজাহাজে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি এবং রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। বিমানের প্রকৌশল ও নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে উড়োজাহাজটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
একই উড়োজাহাজ ব্যবহার করে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমানকে ভিভিআইপি ফ্লাইটে বহন করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি তদন্তে সম্প্রতি একটি কমিটি গঠন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। কমিটির জমা দেওয়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন বিমানের উপপ্রধান প্রকৌশলী (বেস মেইনটেন্যান্স) মো. মনসুরুল আলম। সদস্যসচিব ছিলেন ব্যবস্থাপক (অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন এবং সদস্য ছিলেন উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশিক্ষণ–এয়ারক্রাফট/অ্যারো) মো. জুবিয়ারুল ইসলাম।
তদন্ত প্রতিবেদনটি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। প্রতিবেদনের বিষয়টি বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিভাগে জমা পড়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিমানের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়ম, বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৯ ও ১৭ ডিসেম্বর উড়োজাহাজটির রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে একাধিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। নথি অনুযায়ী, ১০ ডিসেম্বরের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে শেষ করা হয়। কিন্তু বোয়িং ৭৮৭–৯ উড়োজাহাজের জন্য নির্ধারিত সময়ের তুলনায় এটি অস্বাভাবিকভাবে কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ত্রুটি নির্ণয় বা কার্যকারিতা পরীক্ষার বিস্তারিত লগ এবং সংশ্লিষ্ট জনবলের রেকর্ড উপস্থাপন করতে না পারাকে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব ছিল। ১৫ দিনের মধ্যে একই ত্রুটি তিনবার দেখা দিলেও সেটিকে পুনরাবৃত্তিমূলক ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
বিমানের সিস্টেম সাধারণত সর্বশেষ ২৭টি ফ্লাইটের তথ্য সংরক্ষণ করে। কিন্তু তদন্ত শুরুর সময় পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে গুরুত্বপূর্ণ যান্ত্রিক তথ্য সময়মতো সংগ্রহ বা সংরক্ষণ করা হয়নি বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
২১ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে সিলেটগামী বিজি–২০২ ফ্লাইট আকাশে থাকার সময় আবারও ভিএফএসজি বিকল হয়ে যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন ত্রুটির কারণে অগ্নিকাণ্ড বা গিয়ারবক্সে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
প্রকৌশল বিভাগের ভুল ত্রুটি নির্ণয়ের কারণে এমন একটি উড়োজাহাজ ভিভিআইপি ফ্লাইটে ব্যবহৃত হওয়ায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বারবার যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন, অন্য উড়োজাহাজ থেকে যন্ত্রাংশ খুলে আনা, অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং পরিবহন ব্যয়ের কারণে প্রায় ২৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির মতে, এটি কেবল একটি যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের ঘটনা নয়; বরং পুরো ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনে বিমানের দুই প্রকৌশলী হীরালাল ও মো. সাইফুজ্জামান খানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কমিটির মতে, ত্রুটি সংশোধন ও উড়োজাহাজটিকে পুনরায় পরিষেবায় ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা যথাযথ সতর্কতা ও যাচাই–বাছাই করেননি।
বিশেষ করে কম ফুয়েল প্রেসারের সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও উড়োজাহাজটিকে ফ্লাইটের জন্য ছাড়পত্র দেওয়াকে গুরুতর সিদ্ধান্তগত ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।