
প্রতিনিধি 11 May 2026 , 11:31:44 প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ে ব্যাপক পরিবর্তন ও পরিমার্জন আনতে যাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এর অংশ হিসেবে চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণির ইতিহাস ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস এবং স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী ও অবদান নিয়ে পৃথক অধ্যায় যুক্ত করা হচ্ছে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, নতুন শিক্ষাক্রমের আওতায় পাঠ্যবইগুলোতে ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি এবং জীবনমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণিতে শারীরিক শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ জয়’ বা আনন্দময় শিক্ষা এবং কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা নামে তিনটি নতুন বই বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করা হবে।
এছাড়া চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণিতে খেলাধুলা ও দেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে আলাদা বই থাকবে। এতে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, কারাতে ও দাবার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি দেশীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধ তুলে ধরা হবে। এসব বিষয়ের মূল্যায়ন ব্যবহারিক ভিত্তিতে হবে বলে জানানো হয়েছে।
চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণির ইতিহাস এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় পুনর্গঠন করা হচ্ছে। এর মধ্যে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং ১৯৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর অবদান নিয়ে নতুন অধ্যায় যুক্ত করা হচ্ছে।
এছাড়া নব্বইয়ের গণআন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়েও নতুনভাবে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবদান তুলে ধরার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানার সুযোগ তৈরি করা হবে।

এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের জন্য বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে ৪ থেকে ৭ মে পর্যন্ত একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের ২৫৭ জন শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ অংশ নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ নূর-ই-আলম সিদ্দিকী ও শাহ শামীম আহমদের তত্ত্বাবধানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
কর্মশালায় অংশ নেওয়া শিক্ষকরা জানান, পাঠ্যবইয়ে তথ্য, ভাষা ও উপস্থাপনায় নানা ভুলত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো সংশোধনের পাশাপাশি বইগুলোকে শিক্ষার্থীবান্ধব ও আকর্ষণীয় করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এবার আগের তুলনায় কম আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ থাকায় কাজ সহজ হয়েছে বলেও তারা জানান।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতিহাসের উপস্থাপন অবশ্যই নিরপেক্ষ ও তথ্যনির্ভর হওয়া উচিত। একজন শিক্ষক বলেন, “ইতিহাসকে কোনো পক্ষপাত ছাড়া উপস্থাপন করতে হবে। যার যতটুকু অবদান আছে, সেটাই তুলে ধরা জরুরি। শিক্ষার্থীরা যেন সঠিক তথ্য জানতে পারে।”
এনসিটিবির এক কর্মকর্তা জানান, পাঠ্যবইয়ে শুধু ইতিহাস নয়, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলাভিত্তিক আলাদা বই যুক্ত করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে।
এছাড়া বাংলা, বিজ্ঞান, পৌরনীতি ও অন্যান্য বিষয়েও কিছু কনটেন্ট হালনাগাদ করা হচ্ছে। বইয়ের প্রচ্ছদ, ছবি, মানচিত্র ও অলংকরণেও নান্দনিক পরিবর্তন আনা হবে। শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কনটেন্ট উপস্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদুল হক জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ চলছে। জুনের মধ্যেই কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে বড় পরিবর্তন পুরোপুরি এবারই সম্ভব হবে না। ২০২৮ সাল থেকে নতুন কারিকুলাম পুরোপুরি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা কমিয়ে বিষয়ভিত্তিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হবে। ইতোমধ্যে নতুন কারিকুলাম নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে।