
প্রতিনিধি 13 May 2026 , 6:59:56 প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বকাপ মানেই রেকর্ডের খেরোখাতা নতুন করে লেখা। ফুটবল মহাযজ্ঞের ইতিহাস মানেই কিছু অসম্ভব রেকর্ড আর অবিশ্বাস্য সব ঘটনা। যদিও রেকর্ড গড়াই হয় ভাঙার জন্য, তবে বিশ্বকাপের এই অতিমানবীয় অর্জনগুলো আজকের দিনের মহাতারকাদেরও ধরাছোঁয়ার বাইরে। কোটি ফুটবলপ্রেমীর উন্মাদনা আর মাঠের রোমাঞ্চের মাঝে এই অজেয় রেকর্ডগুলোই যেন বিশ্বকাপের অলঙ্কার। বিশ্বকাপের এমন ৯টি রেকর্ড দেখে নেওয়া যাক।

আর্নস্ট উইলিমভস্কি: হারানো ম্যাচে ৪ গোল
১৯৩৮ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের আর্নস্ট উইলিমভস্কি ব্রাজিলের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য ৪টি গোল করেছিলেন। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, তাঁর দল ম্যাচটি হেরেছিল ৬-৫ ব্যবধানে। বিশ্বকাপের মঞ্চে ৪ গোল করাটাই যেখানে অতিমানবীয় ব্যাপার, সেখানে ম্যাচ হেরেও এমন ব্যক্তিগত অর্জন একে এক অনন্য ও বিয়োগান্তক রেকর্ডে পরিণত করেছে। রক্ষণাত্মক কৌশলের আধুনিক ফুটবলে হেরে যাওয়া ম্যাচে কোনো ফুটবলার আবার ৪ গোল করবেন-এমনটা কল্পনা করাও এখন অসম্ভব।

পাওলো মালদিনি: ২,২১৬ মিনিটের লড়াই
ইতালিয়ান কিংবদন্তি ডিফেন্ডার পাওলো মালদিনি চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিলেন এবং অবিশ্বাস্যভাবে একটি মিনিটও মাঠের বাইরে কাটাননি। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের মাঠে তার উপস্থিতির সময় ২,২১৬ মিনিট। বর্তমান ফুটবলে চোটের প্রবণতা, খেলোয়াড়দের রোটেশন পলিসি এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার প্রবণতার কারণে মালদিনির মতো এমন দীর্ঘমেয়াদী ধারাবাহিকতা অর্জন করা বর্তমান প্রজন্মের জন্য কার্যত ধরাছোঁয়ার বাইরে।

রজার মিলা: বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা
ক্যামেরুনের গোলমেশিন রজার মিলা ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ৪২ বছর ৩৯ দিন বয়সে গোল করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, তিনি ১৯৯০ বিশ্বকাপে করা নিজের ৩৮ বছর বয়সের রেকর্ডটিই ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়েছিলেন। যদিও আজকালকার ফুটবলাররা কঠোর ফিটনেস মেনে দীর্ঘ সময় ক্যারিয়ার টেনে নিচ্ছেন, তবুও বিশ্বকাপের মতো চরম শারীরিক সক্ষমতার মঞ্চে ৪২ বছর বয়সে গোল করার মতো ঘটনা পুনরায় ঘটা প্রায় অসম্ভবই।

এসাম এল-হাদারি: সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ফুটবলার
২০১৮ বিশ্বকাপে যখন মিশরের গোলপোস্ট সামলাতে নামলেন এসাম এল-হাদারি, তখন তার বয়স ৪৫ বছর ১৬১ দিন! বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে খেলার এই রেকর্ডটি অনন্য। শুধু খেলাই নয়, সেই ম্যাচে তিনি একটি পেনাল্টিও ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন। আধুনিক ফুটবলের যে গতি এবং ফিটনেসের চাহিদা, তাতে ৪৫ বছর বয়সে এসে বিশ্বকাপের মঞ্চে গ্লাভস হাতে দাঁড়ানোটা এখন রূপকথার মতোই শোনায়।


রাফায়েল মার্কুয়েজ: অধিনায়কত্বের ‘পাঞ্জা’
মেক্সিকান কিংবদন্তি রাফায়েল মার্কুয়েজ এমন এক কীর্তি গড়েছেন যা ভাবলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় যিনি পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০০২ থেকে ২০১৮) নিজের দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। টানা ২০ বছর ধরে দলের অধিনায়ক হিসেবে নিজের জায়গা ধরে রাখা এবং ছন্দ বজায় রাখা বর্তমান সময়ে অবিশ্বাস্য। এই রেকর্ডের আশেপাশে পৌঁছানোও যেকোনো ফুটবলারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

পেলে: সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার মুকুট
ফুটবল সম্রাট পেলে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে যখন প্রথম গোল করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর ২৩৯ দিন। সেই আসরেই সর্বকালের অন্যতম সেরা হ্যাটট্রিক করেন এবং ফাইনালও জেতেন। বর্তমান সময়ে কিশোর ফুটবলারদের প্রতিভা থাকলেও এত কম বয়সে বিশ্বকাপের মতো চাপের মঞ্চে গোল করা এবং ফাইনাল জেতা পেলের সেই রেকর্ডকে আজও অমর করে রেখেছে।

ওলেগ সালেঙ্কো: এক ম্যাচেই বাজিমাত
এক ম্যাচে পাঁচ গোল! ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কো এই অতিমানবীয় রেকর্ডটি গড়েন। মজার ব্যাপার হলো, সেই আসরে রাশিয়া গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও এক ম্যাচের এই ৫ গোলের সৌজন্যেই সালেঙ্কো গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। বর্তমানের জমাট রক্ষণভাগের যুগে এক ম্যাচে ৫ গোল করা এখনকার স্ট্রাইকারদের কাছে এক অলীক স্বপ্ন।

জসিপ শিমুনিচ: এক ম্যাচেই তিন হলুদ কার্ড!
২০০৬ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার জসিপ শিমুনিচ এমন এক কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন যা ফুটবল ইতিহাসে আর কখনো ঘটা সম্ভব নয়। রেফারি গ্রাহাম পোলের এক মারাত্মক ভুলে একই ম্যাচে শিমুনিচকে তিনবার হলুদ কার্ড দেখানো হয়েছিল! আসলে শিমুনিচ অস্ট্রেলিয়ান টানে ইংরেজি বলায় রেফারি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং তাকে লাল কার্ড দেখাতে ভুলে গিয়েছিলেন। বর্তমান ফুটবলে ভিএআর এবং প্রযুক্তির যে জয়জয়কার, তাতে এই ধরণের ভুল হওয়া এখন একেবারেই অসম্ভব। শিমুনিচের এই অদ্ভুত রেকর্ডটি বিশ্বকাপের পাতায় চিরকাল অমলিন ও অজেয় হয়েই থাকবে।

জাঁ ফন্তেইন: এক আসরে ১৩ গোল
১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জাঁ ফন্তেইন একাই করেছিলেন ১৩টি গোল। আজ পর্যন্ত এই অনবদ্য কীর্তি ছোঁয়া তো দূরের কথা, এর ধারেকাছেও কেউ পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমানে সাধারণত ৫ বা ৬ গোল করলেই গোল্ডেন বুট জেতা নিশ্চিত হয়ে যায়। আজকের দিনের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ এবং অতিমাত্রায় কৌশলনির্ভর ফুটবলের যুগে একই আসরে এমন গোল উৎসব প্রায় অলৌকিক ব্যাপার। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফন্তেইনের এই কীর্তিকে বিবেচনা করা হয় সর্বকালের সেরা এবং অজেয় রেকর্ড হিসেবে।