
প্রতিনিধি 1 March 2026 , 4:15:31 প্রিন্ট সংস্করণ

আজ জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে কবি মোহন রায়হান পুরস্কার গ্রহণ করা নিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে চান।
সংবাদ সম্মেলনে কবি মোহন রায়হান বলেন, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ প্রদানকে কেন্দ্র করে একটি অনভিপ্রেত, দুঃখজনক এবং বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমি কখনো এই পুরস্কারের প্রত্যাশী ছিলাম না, কোনো তদবির বা প্রচেষ্টা করিনি। বাংলা একাডেমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমাকে মনোনীত করেছিল। কিন্তু পুরস্কারের তালিকায় আমার নাম ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি সুসংগঠিত অপপ্রচার শুরু হয়। একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী—যারা অতীতে স্বৈরাচার ও স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির সহচর ছিল—নতুন পরিচয়ের আড়ালে সামাজিক মাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়াতে থাকে। এমনকি ২২ জন লেখক, কবি ও সাংবাদিকের নামে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়, যাদের অনেকেই পরে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন—তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। একজন নারী সাংবাদিক কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেছেন, “আমি কি কখনো তোমার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিতে পারি?”
কবি আরও বলেন, পুরস্কার প্রদানের আগের দিন পর্যন্ত সব আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে, ৪১ বছর আগে রচিত একটি কবিতাকে অজুহাত করে আমার পুরস্কার স্থগিত করা হয়। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম, অথচ অন্যদের ডাকা হলেও আমাকে আর ডাকা হয়নি। এই আচরণ শুধু ব্যক্তিগত অপমান নয়—এটি মুক্তচিন্তার প্রতি অবমাননা। ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করার পর দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্রধান সংবাদমাধ্যম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে। বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রশ্ন তোলেন—যদি শিল্প-সাহিত্যকে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে রাখার অঙ্গীকার থাকে, তবে এই সিদ্ধান্ত তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কেন? পরবর্তীতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়—প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিক্রমে আগামী ২ মার্চ আমাকে পুরস্কার প্রদান করা হবে।

মোহন রায়হান বলেন, এই ঘোষণার পর আমার পুরস্কার গ্রহণ বা বর্জন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক শুরু হয়। আমরা ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভা আহ্বান করি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মত—পুরস্কার গ্রহণের পক্ষে। যুক্তি ছিল, ষড়যন্ত্রের কাছে নতি স্বীকার করা মানে অপশক্তিকে জয়ী হতে দেওয়া। আবার অনেকে মত দেন—এই অপমানের প্রতিবাদে পুরস্কার বর্জনই নৈতিক অবস্থান হবে। আমি গভীরভাবে ভাবলাম। আমি কোনো পদক বা অর্থের কাঙাল নই। জীবনের সায়াহ্নে এসে সামান্য স্বীকৃতি ও সম্মানের প্রত্যাশাই আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, আমি স্মরণ করি—রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে আমরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান-এর সঙ্গেও দুই দফা আলোচনা হয়েছে। আমরা স্পষ্ট বলেছিলাম—আমাদের চাওয়া একটাই, কলমের স্বাধীনতা। কথা বলার স্বাধীনতা। তিনি বলেছিলেন—“ভালো কাজে উৎসাহ দেবেন, ভুল করলে সমালোচনা করবেন।” আমি সেই প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা রেখেই পুরস্কার গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। তবে পুরস্কারের অর্থ আমি ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করব না। সেটি কোনো সামর্থ্যহীন কবি, লেখক বা সাংস্কৃতিক কর্মীর কল্যাণে প্রদান করার আহ্বান জানাচ্ছি।
কবি বলেন, একই সঙ্গে আমি দৃঢ়ভাবে দাবি জানাই—পুরস্কার প্রদানের নীতিমালা সংস্কার করা হোক। স্বচ্ছ, দলনিরপেক্ষ, বিশেষজ্ঞনির্ভর ও সর্বজনগ্রাহ্য প্রক্রিয়া প্রবর্তন করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক বা স্থগিতের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অতীতেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। দেশের প্রখ্যাত কবি শামসুর রাহমান-কে নিয়ে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রসঙ্গে বিতর্কের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে গণভবনে ডেকে সম্মানিত করেছিলেন। সেই উদারতার ঐতিহ্য আমরা স্মরণ করি।
কবি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকেই যেন আমি এই পুরস্কার গ্রহণ করতে পারি। যদি প্রয়োজন হয়, দিন পরিবর্তন করা হোক—কিন্তু প্রক্রিয়াটি মর্যাদাপূর্ণ হোক। আমি জানি—এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকবে। তবুও আমি বিশ্বাস করি, বিভাজনের চেয়ে ঐক্য, প্রতিহিংসার চেয়ে প্রজ্ঞা, এবং অপমানের চেয়ে মর্যাদা বেছে নেওয়াই আমাদের কর্তব্য। আমি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে এই পুরস্কার গ্রহণ করছি।