
প্রতিনিধি 24 February 2026 , 12:30:27 প্রিন্ট সংস্করণ

সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর বাতাসে আভিজাত্যের সঙ্গে মিশে থাকে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশার পারদ চড়িয়েই গত গ্রীষ্মে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিভার প্লেট থেকে ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরোয় রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমিয়েছিলেন ১৮ বছর বয়সী মিডফিল্ডার ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনো। তাকে ঘিরে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন মাদ্রিদের মাঝমাঠে সৃজনশীলতার নতুন স্থপতি হবেন এই আর্জেন্টাইন বিস্ময়বালক।
কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে চিত্রটা পাল্টে গেছে নাটকীয়ভাবে। বার্নাব্যুর আলো-ঝলমলে মঞ্চে যে তরুণকে ভবিষ্যতের ভরসা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, তিনিই এখন ডাগআউটের ‘অদৃশ্য’ চরিত্র। মাঠের লড়াইয়ে যখন দল হাপিত্যেশ করছে, তখনও তার নাম আসে না বদলি তালিকায়।
অস্থির মাদ্রিদ, অনিশ্চিত মাস্তানতুয়োনো
রিয়াল মাদ্রিদ বর্তমানে কিছুটা অস্থির সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। গত শনিবার ওসাসুনার কাছে ২-১ গোলের হার সেই অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পরও আক্রমণে নতুনত্ব আনতে মাস্তানতুয়োনোকে নামানো হয়নি।
দলের কৌশলগত পরিবর্তনও তার জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলেছে। সাবেক কোচ জাবি আলোনসোর সময় শুরুর দিকে সম্ভাবনার আভাস মিললেও বর্তমানে কোচ আলভারো আরবেলোয়ার পরিকল্পনায় তিনি যেন ঠিক জায়গা পাচ্ছেন না। টানা তিন ম্যাচে এক মিনিটের জন্যও মাঠে নামা হয়নি তার।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে বদলি হিসেবে নেমে খেলেছিলেন মাত্র ৯ মিনিট, এটাই রিয়ালের জার্সিতে তার সর্বশেষ উপস্থিতি। যে খেলোয়াড়কে মাঝমাঠের ভবিষ্যৎ স্তম্ভ ভাবা হচ্ছিল, তার জন্য এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে নির্মম।
আর্জেন্টিনায় বাড়ছে উৎকণ্ঠা
মাস্তানতুয়োনোর এই পরিস্থিতি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে আর্জেন্টিনায়ও। সামনে স্পেনের বিপক্ষে ফিনালিসিমা, এরপর উত্তর আমেরিকায় ২০২৬ বিশ্বকাপ। ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে যিনি শুরুর একাদশে ছিলেন, সেই খেলোয়াড় ক্লাবে নিয়মিত সুযোগ না পেলে জাতীয় দলে তার ছন্দ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

আর্জেন্টাইন ফুটবল মহলে আলোচনা একজন তরুণ প্লে-মেকারকে ধারাবাহিক ম্যাচ অনুশীলনের বাইরে রাখলে তার আত্মবিশ্বাস ও ধার দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের উচ্চমাত্রার চাপ সামলাতে ম্যাচ ফিটনেসই সবচেয়ে বড় পুঁজি।
চোট, কৌশল আর প্রতিযোগিতা
শুরুর দিকে মানিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়ায় ভালোই এগোচ্ছিলেন মাস্তানতুয়োনো। কিন্তু চোট তার ছন্দ কেটে দেয়। চোট থেকে ফেরার পর দেখা যায়, দলে কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। মাঝমাঠে চারজনের কম্বিনেশন দাঁড় করিয়েছেন কোচ, যেখানে জায়গা করে নেয়া কঠিন।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা তারকাদের উপস্থিতি। অভিজ্ঞদের ওপর ভরসা করেই এগোতে চাইছেন কোচিং স্টাফ। সাম্প্রতিক ফল ভালো না হওয়ায় ঝুঁকি নেয়ার মানসিকতাও কম। ফলে তরুণ প্রতিভার জন্য সুযোগের জানালা ক্রমেই সরু হয়ে আসছে।
সমালোচনার ঝড়
আর্জেন্টিনার সাবেক মিডফিল্ডার ও রিভার প্লেটর কিংবদন্তি নরবার্তো আলোনসো প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন রিয়াল মাদ্রিদের সিদ্ধান্তের। তার ভাষায়, ওরা ছেলেটাকে শেষ করে দিচ্ছে। সুযোগ না দিলে সে নিজেকে প্রমাণ করবে কীভাবে?
এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তরুণ প্রতিভা বিকাশে বড় ক্লাবগুলোর দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত
জানুয়ারির দলবদলে ইতালির চ্যাম্পিয়ন নাপোলি মাস্তানতুয়োনোকে ধারে নিতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। সেখানে গেলে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল বেশি। কিন্তু বার্নাব্যু ছেড়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি নিজেই লড়াই করে জায়গা করে নেয়ার আশায়।
এখন প্রশ্ন উঠছে, সেটি কি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল?
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরোর বিনিয়োগ কি তবে বেঞ্চেই পড়ে থাকবে? তরুণ প্রতিভা কি ধৈর্য হারাবেন, নাকি সময়ের সঙ্গে বদলে যাবে কৌশল? বার্নাব্যুর বেঞ্চ থেকে বিশ্বকাপের সাইডলাইনে পৌঁছানো এমন পরিণতি কেউই চান না। কিন্তু ফুটবলে সময় ও সুযোগ দুই-ই নির্মম।