
প্রতিনিধি 7 March 2026 , 3:12:27 প্রিন্ট সংস্করণ

রমজানের পবিত্র মাস মুসলিম উম্মাহর কাছে ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের মাস। এই মাসের বুকে জড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসের কিছু অবিস্মরণীয় ঘটনা। তেমনই এক গৌরবময় স্মৃতি হলো ঐতিহাসিক বদর দিবস। হিজরির দ্বিতীয় সনের ১৭ রমজান, মদিনা থেকে প্রায় সত্তর মাইল দূরের বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল সত্য ও মিথ্যার, ইমান ও কুফরের এক ঐতিহাসিক সংঘর্ষ-বদরের যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক বিজয়ের কাহিনি নয়; এটি ছিল আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস, ত্যাগ এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মানবতার মুক্তির দূত প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের অধিকাংশই ছিল প্রায় নিরস্ত্র এবং যুদ্ধের সরঞ্জামও ছিল অতি সীমিত। অন্যদিকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে অবিশ্বাসীদের নেতা আবু জাহেলের নেতৃত্বে প্রায় এক হাজার প্রশিক্ষিত সৈন্যের সুসজ্জিত বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছিল। বাহ্যিক শক্তি ও সামরিক প্রস্তুতির দিক থেকে এই যুদ্ধ ছিল অসম ও প্রায় অসম্ভবের এক লড়াই।
কিন্তু মানুষের হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে রয়েছে মহান আল্লাহর অশেষ কুদরত। বদরের প্রান্তরে সেই কুদরতেরই এক অবিস্মরণীয় প্রকাশ ঘটে। আল্লাহতায়ালা তাঁর ওপর ভরসা রাখা ক্ষুদ্র কিন্তু ইমানদীপ্ত দলটিকে বিজয় দান করেন। এভাবে বদরের ময়দানে রচিত হয় ন্যায় ও অন্যায়ের এক নতুন ইতিহাস, যা যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
যুদ্ধের আগে আল্লাহর রাসুল (সা.) গভীর আবেগ ও আকুতি নিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছিলেন-‘হে আল্লাহ! তুমি যদি চাও দুনিয়াতে তোমার ইবাদত করার কেউ না থাকুক, তাহলে এ ক্ষুদ্র দলটিকে নিশ্চিহ্ন হতে দাও।’

আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় নবীর সেই দোয়া কবুল করেন। কুরাইশদের অহংকার ও দম্ভ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেন এবং চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, বাহ্যিক উপায়-উপকরণই সবকিছু নয়; প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে ইমান ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার মধ্যে।
বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের পক্ষ থেকে সত্তর জন নিহত হয় এবং আরও সত্তর জন বন্দি হয়। অন্যদিকে মুসলমানদের মধ্যে শহীদ হন মাত্র চৌদ্দ জন সাহাবি। যুদ্ধের এই ফলাফল ছিল মানুষের কল্পনারও বাইরে। কিন্তু এটিই ছিল মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রমাণ-তিনি চাইলে স্বল্পসংখ্যক মানুষ দিয়েও বৃহৎ শক্তিকে পরাজিত করতে পারেন।
মদিনায় হিজরত করার দ্বিতীয় বছরে আল্লাহতায়ালা অত্যাচারিত মুসলমানদের আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের অনুমতি দেন। তখন হজরত জিবরাইল (আ.) কুরআনের আয়াত নিয়ে আসেন-‘যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদের (যুদ্ধের) অনুমতি দেওয়া হলো, কারণ তাদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে সক্ষম। তাদের নিজেদের বাড়িঘর থেকে অন্যায়ভাবে বিতাড়িত করা হয়েছিল শুধু এ কারণে যে তারা বলত, আমাদের প্রভু আল্লাহ।’ (সুরা হজ)। এই ঐশী নির্দেশনার আলোকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। সেই যুদ্ধই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বড় বিজয়ের সূচনা করে এবং সত্যের পথে সংগ্রামরত মানুষের জন্য স্থায়ী প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
প্রতিবছর ১৭ রমজান এলে বিশ্ব মুসলিম গভীর শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করে বদরের সেই ঐতিহাসিক বিজয়কে। স্মরণ করে বদরের শহীদদের আত্মত্যাগকে। তাদের ত্যাগ, ইমান ও আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস আমাদের শিক্ষা দেয়-সংখ্যা বা শক্তি নয়, সত্যের পথে দৃঢ় অবস্থান এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাই প্রকৃত বিজয়ের চাবিকাঠি।