
প্রতিনিধি 4 February 2026 , 5:00:04 প্রিন্ট সংস্করণ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-০৯ আসন থেকে নির্বাচন করবেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা । ঢাকা-০৯ হল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ৩০০টি নির্বাচনী এলাকার একটি। এটি ঢাকা জেলায় অবস্থিত জাতীয় সংসদের ১৮২নং আসন। ঢাকা-৯ আসন ঢাকা জেলার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ০১, ০২, ০৩, ০৪, ০৫, ০৬, ০৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নং ওয়ার্ড তথা সবুজবাগ, খিলগাঁও,মুগদা ও মান্ডা থানা নিয়ে গঠিত।
১৯৯৪ সালের ৭ অক্টোবর জন্ম নেওয়া ডা. তাসনিম জারা পেশায় একজন চিকিৎসক,শিক্ষক,উদ্যোক্তা এবং রাজনীতিবিদ। তাসনিম জারা রাজধানীতে জন্মগ্রহণ এবং বেড়ে ওঠেন। ডা. তাসনিম জারার পিতা ফখরুল হাসান ও তার মাতা আমেনা আক্তার দেওয়ান। তাসনিম জারা বাংলাদেশি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও মানবাধিকারকর্মী খালেদ সাইফুল্লাহকে বিয়ে করেন। সাইফুল্লাহ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবাধিকার আইন অধ্যয়ন করেছেন ।
ঢাকা-০৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা ২০২৪ সালের শেষ দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে গঠিত নাগরিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। শুরুতে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সংগঠন পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে রূপান্তরিত হয়। তিনি দলটির প্রবাসী শাখা গঠনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আনুষ্ঠানিক যাত্রার পর, তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা ‘রাজনৈতিক পরিষদ’-এর সদস্যও, যেখানে দশজন শীর্ষস্থানীয় নেতা অন্তর্ভুক্ত আছেন।রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি, তাসনিম জারা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক শাসনের পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তিনি দলীয় শীর্ষ নেতা সারজিস আলম-এর বিরুদ্ধে তার আর্থিক অবস্থান সংক্রান্ত অসামঞ্জস্যতার অভিযোগ প্রকাশ্যে তুলেন। তিনি সারজিস আলমকে ১০০ গাড়ির শোভাযাত্রার অর্থায়নের উৎস প্রকাশ করতে আহ্বান জানান।
২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর, জারা জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের মধ্যে অন্যতম পরিচিত নাম ডা. তাসনিম জারা। চিকিৎসা, গবেষণা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় তাঁর বহুমাত্রিক কাজ তাঁকে দেশ-বিদেশে পরিচিত করে তুলেছে।
তাসনিম জারা ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। চিকিৎসা শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণাভিত্তিক জ্ঞানে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এভিডেন্স-বেইজড হেলথ কেয়ার বিষয়ে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
পেশাগত জীবনের শুরুতে তাসনিম জারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তার হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে রেসিডেন্ট মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান এবং সেখানে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এ জরুরি চিকিৎসা বিভাগের চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
২০২১ সালে তিনি ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি হাসপাতালসমূহে অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা বিভাগের রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল স্কুলে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লিনিক্যাল সুপারভাইজার হিসেবে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সুপারভাইজারের পদে উন্নীত হন।

চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে তাসনিম জারা ‘সহায় হেলথ’ নামে একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এই প্ল্যাটফর্ম বাংলাভাষী মানুষের জন্য প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্য তথ্য সহজভাবে উপস্থাপন করে। ২০২৩ সালে তিনি ‘সহায় প্রেগন্যান্সি’ নামক একটি মোবাইল অ্যাপের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেন, যা গর্ভাবস্থার প্রতিটি সপ্তাহের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করে।
গবেষক হিসেবেও তাসনিম জারার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তিনি জেএসিসি: কার্ডিওভাসকুলার ইন্টারভেনশনস এবং ফ্রন্টিয়ার্স ইন গ্লোবাল উইমেন’স হেলথসহ একাধিক আন্তর্জাতিক পর্যালোচিত জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন।
চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় তাসনিম জারার কাজ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি ইতিবাচক ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
চিকিৎসা ও গবেষণার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন ডা. তাসনিম জারা। তরুণদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংস্কার—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর কাজ দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে।
২০১৪ সালে তাসনিম জারা জাতিসংঘের বাংলাদেশ যুব উপদেষ্টা প্যানেলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই প্যানেলের মাধ্যমে তিনি যুবসম্পৃক্ততা, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় যুবদের ভূমিকা জোরদারে জাতিসংঘকে পরামর্শ প্রদান করেন। অল্প বয়সেই এই দায়িত্ব পাওয়া তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়েও তাসনিম জারা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশের স্কুল পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে প্রচার চালিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, ছোটবেলা থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা গেলে সামাজিক কুসংস্কার দূর হবে এবং ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করা সম্ভব হবে।
কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে তাসনিম জারা সাধারণ মানুষের জন্য বাংলাভাষায় স্বাস্থ্যবিষয়ক ভিডিও তৈরি শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত এসব ভিডিওতে তিনি কোভিড-১৯ প্রতিরোধ, টিকা সংক্রান্ত সচেতনতা, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং মানসিক সুস্থতা নিয়ে সহজ ভাষায় তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর এই উদ্যোগ দ্রুত ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বিবিসি, স্কাই নিউজ, আইটিভি এবং ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর মতো প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাসনিম জারার কার্যক্রম ও ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। জনস্বাস্থ্য তথ্যকে সহজ, প্রমাণভিত্তিক ও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস তাঁকে বৈশ্বিক পরিসরেও পরিচিত করে তুলেছে।
চিকিৎসা, সামাজিক সচেতনতা এবং নীতিনির্ধারণ—এই তিন ক্ষেত্রের সমন্বয়ে তাসনিম জারা আজ বাংলাদেশের তরুণ সমাজের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।
হলফনামার সম্পদের বিবরণ
নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এনসিপির সাবেক নেত্রী ও ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৯ লাখ টাকা। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামায় তিনি এ তথ্য উল্লেখ করেছেন।
হলফনামা অনুযায়ী, ডা. তাসনিম জারার বার্ষিক আয় ৭ লাখ ১৩ হাজার ৫৯৭ টাকা। এর মধ্যে চাকরি থেকে আয় দেখানো হয়েছে ৭ লাখ ১৩ হাজার ৩৩৩ টাকা। তিনি গত অর্থবছরে আয়কর দিয়েছেন ৩৪ হাজার ৫৭ টাকা। সম্পদের বিবরণে দেখা যায়, তার নামে কোনো বাড়ি, ফ্ল্যাট, কৃষিজমি বা অকৃষিজমি নেই। তবে তার কাছে রয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার অলংকার। ব্যাংকে তার নামে জমা আছে মাত্র ১০ হাজার ১৯ টাকা, হাতে নগদ রয়েছে ১৬ লাখ টাকা। পাশাপাশি তার কাছে রয়েছে ২ হাজার ২৭০ ব্রিটিশ পাউন্ড।
হলফনামায় আরও উল্লেখ করা হয়, ডা. তাসনিম জারার নামে কোনো ঋণ, দায়, মামলা বা সরকারি পাওনা নেই। দেশের বাইরে তার আয় দেখানো হয়েছে ৩ হাজার ২০০ ব্রিটিশ পাউন্ড।স্বামী খালেদা সাইফুল্লাহর সম্পদের বিবরণে দেখা যায়, তার হাতে নগদ রয়েছে ১৫ লাখ টাকা এবং ৬ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড। পাশাপাশি দেশের বাইরে তার বার্ষিক আয় ৩৯ হাজার ৮০০ ব্রিটিশ পাউন্ড।