
প্রতিনিধি 12 January 2026 , 11:44:28 প্রিন্ট সংস্করণ

স্প্যানিশ সুপার কাপ ফাইনালের প্রথম আধা ঘণ্টা তেমন রোমাঞ্চ ছড়াতে পারেনি। তবে মাঠের ভেতরে অদ্ভুত এক বিস্ময় আর চাপা উত্তেজনা ছিল। প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছিল—এ কোন রিয়াল মাদ্রিদ?
মৌসুমের প্রথম ফাইনাল, প্রতিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা—এমন ম্যাচে রিয়ালের আক্রমণাত্মক তাড়না চোখে পড়েনি। বরং রক্ষণাত্মক কৌশলে পিছিয়ে থেকে খেলেছে তারা। বলের দখল কম, আক্রমণ বলতে মূলত প্রতি আক্রমণই ভরসা। বল হারালে দ্রুত পুনরুদ্ধারের তাগিদও ছিল না; অনেকেই নেমে যাচ্ছিলেন নিচে।
রবার্ট লেভানডফস্কি, রাফিনিয়া ও লামিনে ইয়ামালের মতো আক্রমণভাগের বিপক্ষে এমন কৌশলে বেশিক্ষণ টিকে থাকা কঠিন—তা প্রমাণ পেতে বেশি সময় লাগেনি। ৩৫ মিনিটে রিয়াল কোচ জাবি আলোনসোর দলকে প্রথমবার জাল থেকে বল কুড়াতে হয় গোলকিপার থিবো কোর্তোয়াকে।
এর এক মিনিট আগেই নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেছিলেন রাফিনিয়া। বাঁ প্রান্ত ধরে এগিয়ে গিয়েও শটটা ঠিকঠাক নিতে পারেননি। তবে পরের সুযোগে ভুল করেননি ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার। একই রকম আক্রমণ থেকে গোল করে ম্যাচে বার্সাকে এগিয়ে দেন তিনি। জেদ্দার কিং আব্দুল্লাহ স্পোর্টস সিটি তখনও পুরোপুরি উত্তাল না হলেও গোলটি ছিল মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়।
এরপর আরও ১০–১২ মিনিট খেলা এগোয় একই ছকে। আর তারপরই যেন ভেঙে পড়ে উত্তেজনার সব বাঁধ। প্রথমার্ধের যোগ করা তিন মিনিটেই দেখা যায় তিনটি গোল!
একুশ শতকে এল ক্লাসিকোর ইতিহাসে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে তিন গোল—এমন দৃশ্য আগে দেখা যায়নি। কয়েকটি মুহূর্ত আর দুর্দান্ত কিছু মুভে ম্যাচ তখন থ্রিলার সিনেমার রূপ নেয়। বিরতিতে কেউ এগিয়ে নেই, স্কোরলাইন ২–২। পাঞ্চ আর পাল্টা পাঞ্চে জমে ওঠা এক অবিশ্বাস্য ‘ইন্টারভাল’।
৪৬ মিনিটে গঞ্জালো গার্সিয়া, ৪৭ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও ৪৯ মিনিটে লেভানডফস্কির গোল ম্যাচের নাটকে এনে দেয় একের পর এক মোচড়। ফলে দ্বিতীয়ার্ধ নিয়ে প্রত্যাশা ছিল তুঙ্গে। গোল যে হবে, তা ছিল নিশ্চিত—প্রশ্ন শুধু কয়টি।
শেষ বাঁশির পর উত্তর মিললেও কেউ কেউ হয়তো হতাশ হবেন। দ্বিতীয়ার্ধে হয়েছে মাত্র একটি গোল। তবে প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তের উত্তেজনার পারদ এতটাই চড়েছিল যে বিরতির পর কেউ না কেউ গোল করবেই—এমনটাই ধরে নেওয়া হয়েছিল।
আর সেই ‘কেউ’ আবারও রাফিনিয়া। ম্যাচে প্রথম গোল করা এই উইঙ্গারই ৭৩ মিনিটে বার্সাকে এনে দেন জয়সূচক গোল। বক্সের মাথা থেকে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে নেওয়া তাঁর শট রিয়াল ডিফেন্ডার রাউল আসেনসিওর পায়ে লেগে দিক পাল্টে যায়। থিবো কোর্তোয়া পুরোপুরি ভুল পায়ে পড়েন, বল জড়ায় জালে।

এই গোলেই শেষ পর্যন্ত ৩–২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে বার্সেলোনা। মৌসুমের প্রথম শিরোপা জয়ের সঙ্গে সঙ্গে ফাইনালে বার্সা কোচ হান্সি ফ্লিকের জয়রথ আরও দীর্ঘ হয়। এটি তাঁর কোচিং ক্যারিয়ারের ১৫তম ফাইনাল—এখনো পর্যন্ত একটিও হাতছাড়া হয়নি। এই জয়ে কি আছে প্রতিশোধের স্বাদ? গত অক্টোবরে লা লিগায় রিয়ালের মাঠে ২–১ গোলে হেরেছিল বার্সা।
দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে ফ্রেঙ্কি ডি ইয়াংয়ের লাল কার্ডও বার্সার ট্রফি আনন্দ ম্লান করতে পারেনি। ১০ জন নিয়েও ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে ছিল তাদের দাপট। বদলি নেমে কিলিয়ান এমবাপ্পেও রিয়ালের হার ঠেকাতে পারেননি।
৭৬ মিনিটে গঞ্জালো গার্সিয়াকে তুলে এমবাপ্পেকে নামান রিয়াল কোচ জাবি আলোনসো। লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার—গোল চাই। হাঁটুর চোট কাটিয়ে ফেরা ফরাসি তারকা গোল না পেলেও বার্সাকে ১০ জনে নামাতে পেরেছেন। তাঁকে ফাউল করায় লাল কার্ড দেখেন ফ্রেঙ্কি ডি ইয়াং। ফাউলটি লাল কার্ডের যোগ্য ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে।
তবে রিয়াল যে ম্যাচে ফেরার সুযোগ পেয়েছিল এবং তা কাজে লাগাতে পারেনি, সে বিষয়ে প্রশ্ন নেই। যোগ করা সময়ের পঞ্চম ও ষষ্ঠ মিনিটে দুটি নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করে তারা। প্রথমে আলভারো ক্যারেরাস বক্সের ভেতর থেকে সরাসরি বল মারেন গোলকিপার হোয়ান গার্সিয়ার হাতে। পরের মিনিটে রাউল আসেনসিওর হেডও ঠেকান গার্সিয়া। শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বার্সা এবং শুরু হয় সুপার কাপ ধরে রাখার উদ্যাপন। গত বছর এই মাঠেই ফাইনালে ৫–২ গোলে হেরেছিল রিয়াল।
উদ্যাপনের মাঝেও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মুখে হতাশার ছাপ। ম্যাচের সবচেয়ে নান্দনিক গোলটি তাঁর হলেও সেটির স্থায়িত্ব ছিল মাত্র দুই মিনিট। জাতীয় দল ও ক্লাব মিলিয়ে টানা ১৯ ম্যাচে গোলহীন ছিলেন তিনি। প্রথমার্ধের শুরুতেই বাঁ প্রান্তে জুলস কুন্দেকে গতিতে হারিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন—আজ খরা কাটতে পারে। সেটিই বাস্তবে রূপ নিল চোখধাঁধানো এক গোলে।
তবে তিন মিনিট যোগ করা সময় পেরিয়ে চতুর্থ মিনিটে পেদ্রির ডিফেন্স চেরা পাস থেকে লেভানডফস্কির গোল আবার ম্যাচে মোচড় আনে। কিন্তু নাটকের শেষ তখনও বাকি। পাঁচ মিনিট পার হওয়ার পর গঞ্জালো গার্সিয়ার গোলে আবার সমতায় ফেরে রিয়াল।
গোল হতে পারত আরও। দুই অর্ধ মিলিয়ে কোর্তোয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন, প্রথমার্ধে একটি সেভ ছিল গার্সিয়ারও। রিয়ালের ১২টি শটের ১০টি ছিল লক্ষ্যে, বার্সার ১৬টির মধ্যে ৭টি। তবে এসব পরিসংখ্যানের বাইরে আলোচনায় থাকবে রিয়াল কোচ জাবি আলোনসোর কৌশল।
২৬ অক্টোবর লা লিগায় রিয়ালের কাছে হারের পর আর কোনো স্প্যানিশ দলের কাছে হারেনি বার্সা—টানা ১০ ম্যাচে জয় তাদের। লা লিগাতেও দ্বিতীয় স্থানে থাকা রিয়ালের চেয়ে তারা এগিয়ে ৪ পয়েন্টে। সুপার কাপ জয়ের এই মুহূর্ত কি তাহলে বড় কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে?
২০২২ সালের পর থেকে স্প্যানিশ ফুটবলে এক অদ্ভুত ধারাবাহিকতা চলছে। সুপার কাপজয়ী দলই শেষ পর্যন্ত জেতে লিগ শিরোপা—২০২৩ সালে বার্সা, ২০২৪ সালে রিয়াল, আর গত বছর আবার বার্সা। তাহলে কি এবারও সেই ধারাই বজায় থাকবে?