
প্রতিনিধি 14 February 2026 , 8:04:55 প্রিন্ট সংস্করণ

আবদুর রহমান খান: সদ্য অনুষ্ঠিত (১২ ফেব্রুয়ারি-২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি আসনে জয় পেয়ে, এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থান নিশ্চিত করেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ফলে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই হচ্ছেন বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী।
অন্যদিকে, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট-জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে। আর এ কারণে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমানই হচ্ছেন প্রধান বিরোধী দলের নেতা। এ কারণেই মূলত দীর্ঘদিন পর এবার একসাথে পুরুষ প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
এর আগে সর্বশেষ চতুর্থ সংসদে (১৯৮৮ সালে-মেয়াদ ছিল দুই বছর ৭ মাস) বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করায়, সে নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৫২টি আসনে জয়লাভ করে। তখন সংসদ নেতা নির্বাচিত হন মওদুদ আহমদ। অন্যদিকে বিভিন্ন ছোট ছোট দলের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত বিরোধী দল ১৯টি আসনে জয়লাভ করে এবং বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন জাসদ-এর আ স ম আব্দুর রব।
তবে দশম সংসদে বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার পর, একাদশ সংসদে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বিরোধী দলের নেতা হন। পরবর্তীতে ওই সংসদের মেয়াদকালে তার মৃত্যুতে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন তার স্ত্রী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। এরপর আবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদে পুরুষ বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পান জি এম কাদের।
দেশের ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর পর্যায়ক্রমে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে। আর ওই সময় থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত মাঝখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রায় ২ বছর বাদ দিলে, প্রায় সাড়ে ৩ দশক দেশের শাসনক্ষমতা আবর্তিত হয়েছে ২ নারীকে কেন্দ্র করে। আর এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, যার আপাতত ইতি টেনেছে এ দেশের জনগণ।
তাই ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগ, অপরদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু, এই দুই কারণে এবার দীর্ঘ ৩ দশক পর ক্ষমতার চেয়ারে বসতে যাচ্ছেন পুরুষ প্রধনমন্ত্রী। এ ছাড়াও বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে-ইসি ঘোষিত ফলাফলে ৬৮ আসন পেয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর আবারও প্রধান বিরোধী দলীয় পুরুষ নেতা পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মূলত এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর নেতৃত্বে কোনো নারী না থাকায়, এই সমীকরণ সহজ হয়েছে।

এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর একই সাথে জাতীয় সংসদে দুই পুরুষ নেতা পাবেন দেশের জনগণ। সবকিছু ঠিক থাকলে ১৬ অথবা ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিবেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর এমপি হিসেবে শপথ নেয়ার পর, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দেখা যাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে। যার ফলে রাজনীতিতে আসছে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা।
এক কথায় ১৯৮৯-১৯৯০ সালে কাজী জাফর আহমদ ছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ পুরুষ প্রধানমন্ত্রী। এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হয় নারী নেতৃত্বের দীর্ঘ অধ্যায়। সেই হিসাবে প্রায় ৩৬ বছর পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী শপথ নিতে যাচ্ছেন সংসদীয় ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের প্রধানমন্ত্রীদের তালিকা: তাজউদ্দীন আহমদ (১৯৭১-১৯৭২), শেখ মুজিবুর রহমান (১৯৭২-১৯৭৫), মুহাম্মদ মনসুর আলী (১৯৭৫), শাহ আজিজুর রহমান (১৯৭৯-১৯৮২), আতাউর রহমান খান (১৯৮৪-১৯৮৫), মিজানুর রহমান চৌধুরী (১৯৮৬-১৯৮৮), মওদুদ আহমদ (১৯৮৮-১৯৮৯), কাজী জাফর আহমদ (১৯৮৯-১৯৯০), খালেদা জিয়া (১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬?, ২০০১-২০০৬) ও শেখ হাসিনা (১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০২৪)।
অপরদিকে, স্বাধীনতা-পরবর্তী জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন যারা: দেশের রাজনীতিতে প্রথম বার তৃতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। পর্যায়ক্রমে চতুর্থ সংসদে জাসদ এর আ স ম আব্দুর রব। পঞ্চম সংসদে শেখ হাসিনা।
এর পর আবার ৭ম সংসদে খালেদা জিয়া। অষ্টম সংসদে শেখ হাসিনা। নবম সংসদে খালেদা জিয়া। দশম সংসদে খালেদা জিয়া। একাদশ সংসদে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। পরবর্তীতে ওই সংসদের মেয়াদকালে তার মৃত্যুতে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন তার স্ত্রী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন জি এম কাদের।
উল্লেখ্য; শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২৯৭ আসনে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করে- ইসি। এর মধ্যে ২০৯টি আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। আর ৬৮টি বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, ইসলামি আন্দোলন ১টি, খেলাফত মজলিস ১টি, গণসংহতি ১টি, বিজেপি ১টি, গণঅধিকার পরিষদ ১টি এবং স্বতন্ত্র ৭টি আসনে জয় লাভ করেছে।
এ ছাড়াও নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়েছে। এই দুটি আসনের ফলাফল পরে ঘোষণা করা হবে। অপরদিকে ৩০০ আসনের মধ্যে ১টি আসনের ভোট আগেই স্থগিত করা হয়।