
প্রতিনিধি 13 February 2026 , 12:46:28 প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর এবারই প্রথম সরাসরি নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনিও প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে তার মা ও দলের দীর্ঘদিনের নেতা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর থেকেই তার নেতৃত্বে দলটির নির্বাচনী প্রচার, কৌশল নির্ধারণ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা তাকে বাংলাদেশের “সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী” হিসেবে তুলে ধরছেন। বিএনপিও তাকে ‘একক নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা দলটির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তার অতীতের দুর্নীতির অভিযোগ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে তারেক রহমান ও বিএনপি বরাবরই দাবি করে আসছে যে, এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সাবেক শাসক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার প্রচারণার অংশ। তারা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে।
প্রায় সতের বছর যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন-এ রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের সময় তাকে দলীয়ভাবে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা দেওয়া হয়, যা বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।
ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানর হাতে। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি সংগঠিত ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। নানা রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন-সংগ্রাম ও দমন-পীড়নের সময় পার করে এখন দলটি তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আসা ছিল সময়ের দাবি এবং অনেকাংশে অনিবার্য। তবে তার একক নেতৃত্বের প্রথম বড় পরীক্ষা হচ্ছে এই নির্বাচন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে দলকে সংগঠিত ও টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তিনি দূর থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন-এটি তার সমর্থকদের মতে একটি বড় সাফল্য।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, অতীতের বিতর্ক ও সমালোচনাকে ছাপিয়ে তিনি কীভাবে নির্বাচনী লড়াই পরিচালনা করেন এবং ফলাফল যাই হোক, পরবর্তী সময়ে দলকে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেন-সেদিকেই রাজনৈতিক মহলের নজর থাকবে। এবারের নির্বাচন তাই শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; বরং তারেক রহমানের নেতৃত্বের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
যদিও এই নির্বাচনে নেই বিএনপির দীর্ঘকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। দলটির কার্যক্রম অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ করে রাখায় তারা এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
ফলে দলটির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এককালীন মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
সংশয়, দেশে ফেরা, দলের নেতৃত্ব ও নির্বাচন
বাংলাদেশে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়েছিলেন তারেক রহমান। এরপর আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন তিনি।
এর প্রায় সতের বছর পর তিনি ঢাকায় ফিরে এসেছেন গত ২৫শে ডিসেম্বর। যদিও তার কয়েকদিন আগেই তারেক রহমান ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে তার ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তার আশংকা তৈরি করেছিলেন।
নভেম্বরের শেষ দিকে তার মা খালেদা জিয়া যখন অসুস্থ তখন তার ওই পোস্ট আলোচনার ঝড় তুলেছিল এবং তিনি ফিরতে পারবেন কি-না সেই আলোচনায় ও সংশয় তখন তুঙ্গে উঠেছিল।
তার সেই পোস্টের এক পর্যায়ে তিনি লিখেছিলেন , “…. সংকটকালে মায়ের স্নেহ–স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।”
এরপর খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ার মধ্যেই তারেক রহমান ঢাকায় ফেরেন ২৫শে ডিসেম্বর এবং এর মাধ্যমেই আঠারো মাস কারাগার ও সতেরো বছর বিদেশে কাটানোর পর সশরীরে আবার বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে প্রত্যাবর্তন ঘটে তারেক রহমানের।
এর কয়েকদিনের মাথায় ৩০শে ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দশদিন পর চলতি বছরের ৯ই জানুয়ারি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের পদে অভিষিক্ত হন তিনি।
প্রয়াত খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে একটি দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবার পর লন্ডনে থেকেই অবশ্য দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তারেক রহমান ।
এর আগে ২০০২ সালে তাকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করেছিলেন খালেদা জিয়া। পরে ২০০৯ সালে দলের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মনোনীত হয়েছিলেন।
এর আগে ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার আটকের পর থেকেই দলটি আসলে তার নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে তার নেতৃত্বে আসা নিয়ে কখনোই কোনো সংশয় ছিল না”।
আরেকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, তারেক রহমানের সাফল্য হলো প্রতিকূল সময়ে বিদেশে থেকেও দল ভাঙ্গতে না দেয়া কিংবা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারা।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমেই এককভাবে দলের নেতৃত্ব দেওয়া ও নিজের জাতীয় নির্বাচনের প্রথম অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন তারেক রহমান ।
দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান গত ২২শে জানুয়ারি সিলেট দলের নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন।
তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জায়মা জারনাজ রহমানকেও নানা কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে।
শিক্ষা, রাজনৈতিক জীবন, উত্থান
বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান ১৯৬৫ সালের ২০শে নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। বিএনপির নিজস্ব ওয়েবসাইটেও তার এই জন্মতারিখই রয়েছে।
যদিও তার নির্বাচনী হলফনামায় বলা হয়েছে যে তিনি ১৯৬৮ সালের ২০শে নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেছেন।
ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে করে আশির দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন বলে তার দলের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি সেখানে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন কি-না সেই সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ওদিকে নির্বাচন কমিশনে এবার যে হলফনামা মিস্টার রহমান জমা দিয়েছেন তাতে শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘উচ্চ মাধ্যমিক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনপির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় আরও অনেক সামরিক কর্মকর্তা পরিবারের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের পরিবারকেও বন্দি করা হয়েছিলো। তখন তাদের দুই ছেলে তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমানও বন্দি ছিলেন।
দলের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তারেক রহমান ও যোগ দিয়েছিলেন এবং ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সদস্য হিসেবে তিনি আনুষ্ঠানিক বিএনপিতে সক্রিয় হন।
যদিও দলের কয়েকজন নেতা ও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদে আছেন এমন কয়েকজন জানিয়েছেন, তারেক রহমানের দলীয় রাজনীতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিলো ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এবং সেই সময় খালেদা জিয়া যে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করেছিলেন তিনি সেগুলোর দেখভালের সাথে যুক্ত ছিলেন।
তবে দলের রাজনীতিতে তার শক্ত প্রভাব শুরু হয়ে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলো।

বিএনপির সেই শাসনামলে ‘হাওয়া ভবন’ এবং সেটিকে কেন্দ্র করে তারেক রহমান এবং তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পরবর্তীতে ব্যাপক আলোচনার তৈরি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলছেন, ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে হাওয়া ভবন নেয়া হয়েছিলো নির্বাচনী অফিস হিসেবে ব্যবহার করে প্রচার প্রচারণা চালানো ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে কাজ করার জন্য, যাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তারেক রহমান।
“নির্বাচনে জয়লাভের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার হলো। কিন্তু হাওয়া ভবন থেকে গেলো এবং এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলো। এরপর ওয়ান ইলেভেনের পর গ্রেফতার, নির্যাতন ও কারাভোগ শেষে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হলো,” বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ।
২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়ই দলের ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন তারেক রহমান। পরে ২০০২ সালের ২২শে জুন দলের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ তৈরি করে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়।
“এটাই ছিলো দলের রাজনীতিতে তার বড় উল্লম্ফন। জিয়া পরিবারের সদস্য হিসেবেই এটা তিনি পেয়েছেন। তাকে ঘিরে পরে দলের মধ্যে একটি প্যারালাল নেতৃত্ব বলয় তৈরি হয়েছিলো,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
মি. আহমেদ অবশ্য বলেছেন, তারেক রহমান ওই সময়ে সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং দলের তৃণমূলে যোগাযোগ তৈরি করতে পেরেছিলেন।
দুর্নীতি, বিতর্ক, আস্থা ফেরানো ও ভাবমূর্তি তৈরি
তারেক রহমান ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ দেশে ফেরার পর থেকেই তার দল বিএনপি তাকে একক নেতা হিসেবে উপস্থাপনের পাশাপাশি তার একটি ‘ইতিবাচক ভাবমূর্তি’ তৈরির চেষ্টা করছে বলে অনেকে মনে করছেন।
বিএনপিকে এবার তার পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামতে হয়েছে বলে দলের নীতিনির্ধারকরা চাইছেন মি. রহমান যেন ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মধ্যপন্থী গণতন্ত্রের’ একক নেতার প্রতিমূর্তি হিসেবে জনমনে চিত্রিত হতে পারেন।
এর আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ২০০১-০৬ সময়ে চরমভাবে বিতর্কিত হয়ে পড়েছিলো বিএনপি চেয়ারপার্সনের বনানী অফিস, যেটি হাওয়া ভবন নামে পরিচিত ছিলো।
সমালোচনা রয়েছে, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলেও তারেক রহমানই হয়ে উঠেছিলেন সমান্তরাল আরেকটি ক্ষমতার কেন্দ্র – হাওয়া ভবন-কেন্দ্রিক।
দুর্নীতির অভিযোগ উঠছিলো মি. রহমান ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধেও। যদিও তিনি ও তার দল বিএনপি সবসময় এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এগুলোকে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ‘অপপ্রচার’ বলে দাবি করে আসছেন।
আবার বিএনপির ওই মেয়াদে ২০০৪ সালে ঢাকায় তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার জন্যও তারেক রহমান ও হাওয়া ভবনকেই দায়ী করেছিলো আওয়ামী লীগ।
পরে আওয়ামী লীগ আমলে এ সংক্রান্ত মামলার আসামিও করা হয়েছিলো তারেক রহমানকে, যাতে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিলো।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তারেক রহমান। বিএনপি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
তারেক রহমানের নির্বাচনী হলফনামায় মোট ৭৭টি মামলার তথ্য দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি তার বিরুদ্ধে তখনো থাকা সব মামলা থেকে খালাস কিংবা অব্যাহতি পেয়েছেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে তুমুল রাজনৈতিক সংঘাত সহিংসতার জের ধরে বাংলাদেশে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা নিয়েছিলো সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
ওই সময় দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়ে আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের তেসরা সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়েছিলেন তারেক রহমান।
গ্রেফতারের পর র্যাব-এর বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং হেলমেট পরিয়ে ঢাকার একটি আদালতে তোলা হয়েছিল তাকে।
এরপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল।
যদিও তার মাত্র মাস ছয়েক আগেও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হিসেবে তারেক রহমানের ছিল দোর্দণ্ড প্রতাপ।
রিমান্ডে থাকা অবস্থায় মি. রহমানের উপর নির্যাতনে অভিযোগ তখন বেশ জোরালোভাবে দলের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছিল।
মি. রহমানের অভিযোগ, গ্রেফতারের পর সেসময় তাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছিলো।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, তিনি তার গবেষণার জন্য বিভিন্ন পক্ষের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছিলেন যে তারেক রহমানকে সত্যিকার অর্থেই নির্যাতন করা হয়েছিলো, যার উদ্দেশ্য ছিলো তখন তার মা খালেদা জিয়াকে ‘দেশত্যাগে বাধ্য করা’।
পরে ২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে পরিবারের সদস্যদেরকে সাথে নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন তিনি।
খালেদা জিয়া দেশ ছেড়ে না গেলেও তখনকার সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতার মাধ্যমেই তারেক রহমান মুক্তি পেয়েছিলেন বলে প্রচার রয়েছে।
মি. রহমান দেশ ছাড়ার পরপরই ‘আর রাজনীতি করবেন না’ বলে মুচলেকা দিয়েছেন বলেও সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছিলো।
মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, “খালেদা জিয়া নিজেই বলেছিলেন যে তারেক আর রাজনীতি করবে না, লন্ডনে পড়াশোনা করবে”।
বিএনপির প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমদ তার ‘কারাগারে কেমন ছিলাম (২০০৭-২০০৮)’ বইতে লিখেছেন, “এমনও হতে পারে তিনি (খালেদা জিয়া) জেনারেলদের সাথে এই সমঝোতা করেছিলেন যে, তারেক রহমান আপাতত নিজেকে রাজনীতিতে জড়াবেন না এবং এ মর্মে তারেক রহমান কোনো সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরও দিয়ে থাকতে পারেন।”
বিএনপির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন যাবৎ চিকিৎসার জন্য তারেক রহমান লন্ডনে থাকছেন বলা হলেও, পরে ২০১৮ সালের ২৪শে এপ্রিল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন যে, ২০১২ সালে তারেক রহমান ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং এক বছরের মধ্যেই সেটি গৃহীত হয়েছে।
বাংলাদেশে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পর গ্রেফতার হয়েছিলেন তখনকার বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার সাথে একই দিনে একই সাথে আটক হয়েছিলেন তার প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমানও।
পরে অবশ্য আরাফাত রহমান নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেয়ে থাইল্যান্ডে চলে গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। পরে তিনি মালয়েশিয়ায় যান এবং সেখানেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে।
আবার খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের ছয় মাস আগেই গ্রেফতার হয়েছিলেন তারেক রহমানও।
২০১৮ সালে দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডন থেকেই দল পরিচালনার কাজ শুরু করেন মি. রহমান। তবে একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজা পাওয়া ছাড়াও অনেক মামলার আসামি হয়েছেন তিনি আওয়ামী লীগ আমলে।
এক পর্যায়ে তার বক্তব্য- বিবৃতি প্রচার আদালতের মাধ্যমেই বন্ধ করে দেয়া হলে তিনি সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হন এবং ভার্চুয়ালি দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে থাকেন।
তার ঘনিষ্ঠরা বলছেন, অল্প দিনের মধ্যেই একদিকে তৃনমূলের সাথে সরাসরি যোগাযোগ এবং অন্যদিকে দলের নীতিনির্ধারণী কাজে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তারেক রহমানের দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি গত ডিসেম্বরে ঢাকায় ফিরে প্রত্যক্ষভাবে দলের হাল ধরলেন।
“রাজনীতির যে কানাগলি তা যেমন দেখেছেন, তেমনি এদেশের সংঘাত ও প্রতিহিংসার রাজনীতির একটি অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দলের নেতা থেকে সামনে দেশের নেতা হয়ে উঠতে পারেন কি-না সেটিই হবে এখন দেখার বিষয়,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. আহমদ।
“এবারের এই নির্বাচনকে ঘিরে তার সিদ্ধান্তগুলো যে শতভাগ ঠিক হচ্ছে তা কিন্তু এখনি বলা যাবে না। কারণ ৫০টির মতো আসনে তার দলেরই নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। যা তিনি ঠেকাতে পারেননি। পাশাপাশি তার কথাবার্তা, সিদ্ধান্ত, কাদের নিয়ে চলছেন, কি চিন্তা করছেন এগুলো মানুষ গভীর আগ্রহ নিয়েই দেখছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. রহমান।