
প্রতিনিধি 5 February 2026 , 12:57:00 প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো- বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), দ্য গার্ডিয়ানসহ বিভিন্ন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা- বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনকালীন পরিবেশ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।
বিদেশি মিডিয়ার বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও অংশগ্রহণমূলক চরিত্র। অনেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সবার জন্য সমান রাজনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করা হলে নির্বাচন আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বিদেশি সংবাদমাধ্যমের বিশেষ নজরে রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সহিংসতা, বিক্ষোভ কিংবা উত্তেজনা দেখা দিলে তা ভোটের পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতি এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ এবং ডিজিটাল অধিকার-এই বিষয়গুলো নির্বাচনকালীন গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে বিভিন্ন বিশ্লেষণে।
ডয়চে ভেলে, জার্মানি
নির্বাচন ঘিরে সংখ্যালঘু প্রার্থীদের শঙ্কা ও উদ্বেগ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র এবং বিভিন্ন দলের হয়ে মোট ৮০ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। তাদের অনেকেই নিজের এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন।
উদ্বেগ ও শঙ্কার কারণ হিসেবে হুমকি, চাপ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নানামুখী সাম্প্রদায়িক প্রচারণার কথা উল্লেখ করছেন স্বতন্ত্র ও বিভিন্ন দলের সংখ্যালঘু প্রার্থীরা।
এই উদ্বেগ ও শঙ্কার কারণ হিসেবে হুমকি, চাপ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নানামুখী সাম্প্রদায়িক প্রচারণার কথা উল্লেখ করছেন তারা৷
তারা মনে করছেন, সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন নির্বাচনের জন্য অবাধ পরিবেশ এবং ‘লেভেল প্লেয়িং’ মাঠ নিশ্চিত করতে পারেনি। এ কারণে সংখ্যালঘু প্রার্থীরা নির্বাচনের আগের এবং পরের সময়কে নিজের এবং সমর্থকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।
আসন্ন নির্বাচনে ৮০ জন সংখ্যালঘু প্রার্থীর মধ্যে ১২ জন স্বতন্ত্র। বাকিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ জন সংখ্যালঘুকে মনোনয়ন দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। এছাড়া বিএনপির ছয়জন, জাতীয় পার্টির চারজন, জামায়াতের একজন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র একজন সংখ্যালঘু প্রার্থী রয়েছে।
দেখা গেছে বিএনপি এবং জামায়াতের সংখ্যালঘু প্রার্থীরা নিরাপত্তা নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন নন। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার কারণে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটার উপস্থিতির হার কেমন হবে সে বিষয়ে তারা চিন্তিত। জাতীয় পার্টি, বাম দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনেকে নিজেদের ও সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তায় ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে – এমন মত প্রকাশ করেছেন। নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন, কিংবা পুলিশের দিক থেকে তৎপরতা কম বলে মনে করেন তারা। নানা সময় অভিযোগ জানিয়েও সদুত্তর পাননি বলেও অভিযোগ তাদের।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলন করে সংখ্যালঘু প্রার্থী এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের উদ্বেগ ও শঙ্কার বিষয়টি তুলে ধরেছে। চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে এমন শঙ্কার উল্লেখ করে পরিষদ জানায়, জানুয়ারি মাসের ২৭ দিনে বাংলাদেশে ৪২টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে যার মধ্যে হত্যার ঘটনা ১১টি৷ ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ এবং প্রার্থীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে।
সংখ্যালঘু প্রার্থীদের যত উদ্বেগ

সংখ্যালঘু প্রার্থীদের অনেকেই মনে করেন ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই পরিস্থিতি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে । বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ছয়জন এবং বাসদ (মাক্সবাদী) সাতজন সংখ্যালঘুকে মনোনয়ন দিয়েছে। বরিশাল-৫ আসনে বাসদের প্রার্থী, চিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তী মনে করছেন প্রার্থী এবং সংখ্যালঘু ভোটার উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিবিসি,ব্রিটিশ
বিবিসির প্রতিবেদন: জেন জির আন্দোলনে স্বৈরশাসকের পতন, নির্বাচনে ফের পুরোনো শক্তির দাপট
বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন রাহাত হোসেন। সেই মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ওই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের পতন ঘটায়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। জেন জির নেতৃত্বে সংঘটিত এই আন্দোলনকে বিশ্বজুড়ে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সফল তরুণ অভ্যুত্থান হিসেবে দেখা হয়।
অভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতারা অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে এলেও জাতীয় নির্বাচন সামনে আসতেই তাদের প্রভাব কমছে। নতুন গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভাঙনের মুখে পড়েছে, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক নারী নেতা দল ছেড়েছেন।
এই শূন্যতায় এগিয়ে আসছে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো-বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘদিন প্রান্তিক থাকলেও জামায়াত নির্বাচনের আগে সংগঠিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ দলটির অতীত বিতর্ককে আর বড় বাধা হিসেবে দেখছে না বলে বিশ্লেষকদের মত।
বিএনপিও নিজেকে নতুন করে উদার গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি এখন সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে।
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যে ছাত্র আন্দোলন স্বৈরশাসকের পতন ঘটিয়েছে, সেই আন্দোলনের শক্তিরাই এখন রাজনীতির মূল দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে। নির্বাচনের পর তরুণরা হয়তো নতুন করে প্রশ্ন তুলবে-তাদের ত্যাগ ও রক্তপাত আদৌ কাঙ্ক্ষিত ‘নতুন বাংলাদেশ’ এনে দিতে পেরেছে কি না।
আল জাজিরা, কাতার
নির্বাচনের আগে কেন শঙ্কিত বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা?
জাতীয় নির্বাচন সামনে আসতেই বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। অতীতের নির্বাচনী সহিংসতার অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক স্পষ্ট।
রাজশাহীর শিক্ষক সুকুমার প্রামাণিক বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো আশ্বাস দিলেও সংখ্যালঘুদের মধ্যে রাজনীতিকদের ওপর আস্থা কম। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তিতে হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে অনেকেই নিজেদের আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে মনে করছেন।
সংখ্যালঘু নেতারা বলছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচন ঘিরে বারবার ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে শতাধিক সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে হত্যাকাণ্ডও রয়েছে। যদিও সরকার বলছে, এসব ঘটনার বেশিরভাগই সাম্প্রদায়িক নয়, বরং সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত অপরাধ।
রাজশাহীর বিদ্যাধরপুরের গৃহিণী শেফালী সরকার জানান, হাসিনার পতনের পর হামলার স্মৃতি এখনো তাকে তাড়া করে ফেরে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় সেই আতঙ্ক আবার ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে, কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু নেতারা বলছেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এখনো বজায় রয়েছে এবং তারা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আশা করছেন। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অতীতের সহিংসতার বিচার না হওয়ায় ভয় কাটছে না। নির্বাচন ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা ছড়াতে পারে-এই আশঙ্কাই এখন সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
অন্যদিকে, কূটনৈতিক সূত্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট-তারা বাংলাদেশের নির্বাচনকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই দেখছে, তবে নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয় সে প্রত্যাশা প্রকাশ করছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক উপস্থিতি এবং স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
সব মিলিয়ে বিদেশি মিডিয়ার আলোচনায় বাংলাদেশের নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক আস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই আলোচনা আরও তীব্র ও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।