
প্রতিনিধি 26 February 2026 , 12:31:01 প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক সময়ের আতঙ্কের নাম, চরমপন্থী সংগঠন ‘বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’-র শীর্ষ নেতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান লাল্টু আর নেই। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামে নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
তার মৃত্যুতে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অবসান ঘটল এক বৈচিত্র্যময়, রোমাঞ্চকর এবং চরম বিতর্কিত অধ্যায়ের।
এক জীবনে দুই রূপ: মুক্তিযোদ্ধা ও চরমপন্থী
নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবন ছিল চরম বৈপরীত্যে ভরা। ১৯৭১ সালে মাতৃভূমির টানে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি, যুদ্ধ করেছিলেন বীরত্বের সাথে। কিন্তু স্বাধীনতার পর পরিস্থিতির আবর্তে জড়িয়ে পড়েন আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার জগতে। চুয়াডাঙ্গা ও আশেপাশের জেলাগুলোতে তিনি পরিচিতি পান ‘ভয়ঙ্কর লাল্টু’ হিসেবে। কথিত আছে, শত্রুকে হত্যার পর লাশ গুম করায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর, যার ফলে তাকে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের কসাই’ বলেও অভিহিত করা হতো।
আত্মসমর্পণ ও দীর্ঘ কারাবাস

লাল্টুর জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই। তৎকালীন সরকারের আহবানে সাড়া দিয়ে নিজ গ্রাম কয়রাডাঙ্গায় কয়েকশ সহকর্মীসহ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। সে সময় তিনি বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গুলি জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অঙ্গীকার করেছিলেন। জাসদ নেতা কাজী আরেফ আহমেদ হত্যা মামলাসহ প্রায় ৩০টির বেশি মামলার আসামি লাল্টু দীর্ঘ ১৯ বছর কারাভোগ করেন। ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি চুয়াডাঙ্গা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।
পরিবারের ঐতিহ্য ও শেষ জীবন
নুরুজ্জামান লাল্টুর পুরো পরিবারই বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত। তার বড় ভাই মতিয়ার রহমান মন্টুও ছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবের এক আলোচিত নাম। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হয়ে কেন তিনি চরমপন্থার পথে পা বাড়িয়েছিলেন, সেই রহস্য আজও অনুদঘাটিত। জেল থেকে মুক্তির পর তিনি নিভৃত জীবন যাপন করছিলেন এবং কৃষি কাজের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন।
এলাকার প্রতিক্রিয়া
লাল্টুর মৃত্যুতে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রবীণদের মতে, তিনি ছিলেন একাধারে সাহসী যোদ্ধা এবং পরবর্তীতে পথভ্রষ্ট এক নায়ক। তার জানাজায় স্থানীয় মানুষ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থী রাজনীতির রক্তাক্ত ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে নুরুজ্জামান লাল্টুর নাম সবসময় আলোচিত হবে।