
প্রতিনিধি 21 February 2026 , 9:32:19 প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ চলবে না। ইনকিলাব জিন্দাবাদ, ইনকিলাব মঞ্চ- এগুলোর সঙ্গে বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই।
এর উত্তরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এবং এনসিপি-এর মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী নিজ ফেসবুক পেজে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” পোস্ট করেছেন। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টা ১৬ মিনিটে পোস্ট দেন কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। রাত ৭টা ৪০ মিনিটে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট দেন নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী। এই পোস্ট দুইটি মুহুর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
অন্যদিকে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার নিজ ফেসবুকে লিখেছেন, আজকে একজন মন্ত্রী বলেছেন ইনকিলাব আমাদের শব্দ না, ইট ইজ আ ফেইলিওর অব আওয়ার টিচার। অর্থাৎ ‘ইনকিলাব’ হটাতে ইংরেজির দ্বারস্থ হওয়া যাবে, তবু ইনকিলাব মেনে নেওয়া যাবে না। মন্ত্রী সাহেব হয়তো ভুলে গেছেন ৗপনিবেশিক ইংরেজদের হটাতেই উপমহাদেশের বিপ্লবীরা প্রথম ইনকিলাব শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, ইনকিলাব জিন্দাবাদ কী বাংলা শব্দ?
ইনকিলাব এবং ইনকিলাব জিন্দাবাদ—এই দুটি শব্দগুচ্ছ উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে।
‘ইনকিলাব’ শব্দটি আরবি ‘ইনকিলাব’ থেকে এসেছে, যার অর্থ পরিবর্তন, উলটপালট বা বিপ্লব। আরবি থেকে এটি ফারসি ও উর্দু ভাষায় প্রবেশ করে এবং পরে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে। বাংলায় ‘ইনকিলাব’ শব্দের অর্থ বিপ্লব বা আমূল পরিবর্তন। সাধারণত রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ একটি স্লোগান। এখানে ‘জিন্দাবাদ’ শব্দটি ফারসি ‘জিন্দা’ (জীবিত) এবং ‘বাদ’ (হোক বা থাকুক) থেকে এসেছে। ‘জিন্দাবাদ’ অর্থ ‘দীর্ঘজীবী হোক’ বা ‘চিরজীবী হোক’। সুতরাং ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর অর্থ দাঁড়ায়—বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক বা বিপ্লব চিরজীবী হোক।
এই স্লোগানটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়। ভারতীয় উপমহাদেশে বিপ্লবী নেতা ভগত সিং ও তাঁর সহযোদ্ধারা এই স্লোগানকে ব্যাপকভাবে প্রচার করেন। ১৯২৯ সালে দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের পর তিনি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দেন, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। যদিও এই স্লোগানটি প্রথম প্রবর্তন করেন উর্দু কবি ও স্বাধীনতা সংগ্রামী মওলানা হাসরাত মোহানি, ভগত সিংয়ের মাধ্যমে এটি গণমানসে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলা ভাষায় ‘ইনকিলাব’ শব্দটি আজও রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও পরিবর্তনের আহ্বানে ব্যবহৃত হয়। এটি কেবল একটি শব্দ নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও নতুন সমাজব্যবস্থার স্বপ্নের প্রতীক। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ তাই শুধু একটি স্লোগান নয়—এটি সংগ্রাম, সাহস ও আশার এক ঐতিহাসিক ধ্বনি।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শুরুতে বাংলাদেশে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ গণআন্দোলনে পরিণত হলে বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগানের পাশাপাশি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-ও জনমানসে জায়গা করে নেয়। এটি আন্দোলনের পথে পথে গ্রাফিতি, ব্যানার এবং জোরালো ধ্বনি হিসেবে দেখা-শোনা যায় — প্রধানত তরুণদের মাঝেই এই শব্দগুচ্ছের প্রতি একটি দ্বন্দ্বমূলক অনুরণন ও ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি কাজ করেছে। বৈষম্যবিরোধ ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের মাঝে ইনকিলাব জিন্দাবাদের গুরুত্ব অনেক বলে তারা এই আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।