
প্রতিনিধি 18 February 2026 , 12:12:39 প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন দফা পারমাণবিক আলোচনা শুরুর সময় ইরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। খবর এবিসির
ইরান সরকারের দাবি, সরাসরি সামরিক মহড়া পরিচালনার কারণে নিরাপত্তা ও নৌচলাচল-সংক্রান্ত উদ্বেগের জন্য কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রণালিটি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কূটনৈতিক বার্তা।
যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে বিপুল সামরিক শক্তি জড়ো করছে এবং চুক্তি না হলে ইরানের ওপর হামলার হুমকিও দিয়েছে। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কর্মসূচির পরিচালক সিনা আজোদি বলেন, আলোচনার দিনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কাকতালীয় নয়। তার মতে, পারস্য উপসাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব দেখাতে ইরান এমন বার্তা দিতে চেয়েছে।
উত্তেজনার মধ্যেও দুপক্ষের কর্মকর্তারা আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ওমান মধ্যস্থতা করেছে। আলোচনার নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে আলোচনা ভালো হয়েছে এবং পরবর্তী বৈঠকের বিষয়ে সম্মতি হয়েছে। তবে তিনি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিছু নির্দিষ্ট সীমারেখা ঠিক করেছেন, যেগুলো ইরান এখনও পুরোপুরি মানতে রাজি হয়নি।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, উভয়পক্ষ কিছু মূল নীতিগত বিষয়ে সাধারণ সমঝোতায় পৌঁছেছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ বিন হামুদ আল বুসাঈদি বলেন, আলোচনা অভিন্ন লক্ষ্য ও কারিগরি বিষয় চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ভালো অগ্রগতি এনেছে।
মার্কিন প্রতিনিধি দলে ছিলেন স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার।

যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে। যদিও ইরান দাবি করে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরান বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি বিশুদ্ধতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে। চুক্তির বিনিময়ে ইরান চায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটিতে দুটি বিমানবাহী রণতরি পাঠিয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই সামরিক প্রস্তুতি সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত হতে পারে। অন্যরা বলছেন, এটি আলোচনায় চাপ সৃষ্টি করার কৌশল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার আগে বলেন, ইরান চুক্তিতে আগ্রহী বলেই তিনি বিশ্বাস করেন। চুক্তি না করলে ইরানকে কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
এর জবাবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীও এমন আঘাত পেতে পারে, যেখান থেকে উঠে দাঁড়ানো কঠিন হবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আগেভাগে আলোচনার ফল চাপিয়ে না দেওয়ার সতর্কবার্তাও দেন।
হরমুজ প্রণালি অতীতে বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে তেহরান। যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য এই নৌপথ বন্ধ থাকে, তাহলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি বাড়তি চাপ তৈরি করবে। তবে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, প্রণালিটি কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা এমন একসময়ে এলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। এটি কেবল সামরিক মহড়ার অংশ, নাকি কূটনৈতিক বার্তা, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে দুই দেশের প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাবই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এই অঞ্চলের যে কোনো অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।